ক্রুশ্চেভ ও সোভিয়েত ইতিহাস- মনি গুহ

ভিক্টর হুগো নেপলিয়নের জীবনি নিয়ে যে বইটি লিখেছিলেন তার পর্যালোচনা করতে গিয়ে মার্ক্স তার অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার নামক লেখার ভুমিকায় লিখেছিলেন- বিনা মেঘে যেমন বজ্রপাত তেমনি তার লেখায় ঘটনা/ফলাফল (event) স্বয়ং সৃষ্ট। তিনি এর মধ্যে শুধুই একজন ব্যক্তির একক হিংস্র কর্মকান্ড দেখেছেন। অন্যের সাহায্য ছাড়াই এককভাবে  ক্ষমতা চর্চা করতে পারে  বিশ্ব ইতিহাসে যা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে থাকবে এমনটা তার উপর আরোপ করতে গিয়ে তিনি খেঁইয়ালই করলেন না যে তাকে ছোট করতে গিয়ে বরং মহান ব্যক্তি করে ফেলেছেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতি কংগ্রেসের রিপোর্টে ক্রুশ্চেভ-মিকোয়ান গোষ্ঠী যে বক্তব্য রেখেছিল সেক্ষেত্রেও মার্ক্সের উক্তিটি  সমভাবে প্রযোয্য। ক্রুশ্চেভ-মিকোয়ান গোষ্ঠীর রিপোর্ট থেকে আমরা জানতে পারলাম ১৯৩৪ সালের পর থেকে স্তালিন ধিরে ধিরে নিজেকে পার্টি এবং জনসাধারণের উর্ধ্বে নিজেকে স্থাপিত করেছেন। সাংগঠনিক ক্ষেত্রে লেনিনীয় সংগঠন নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে বুর্জোয়া সামরিক স্বৈরতন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছেন। এই অবস্থা একদিকে পার্টি অভ্যন্তরে গণতন্ত্রকে নস্যাত করেছে, যৌথ নেতৃত্বকে  ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, স্বাধীন ব্যক্তিচিন্তা ও পার্টি সভ্যদের কাজকে পঙ্গু করে দিয়েছে এবং স্তালিন সবকিছু করবে এই জাতের ব্যক্তি পুঁজাবাদ  জনতার মধ্যে গড়ে উঠেছে ফলে মহান মানবের উপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। অন্যদিকে, স্তালিন জনতা, পলিটব্যুরো এবং কেন্দ্রিয় কমিটির সাথে দূরত্ব তৈরি করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছেন। মোটকথা, জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক অঙ্গন যেখানেই যা কিছু ঘটে থাকুক না কেন সবকিছু স্তালিনই করেছেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিগত বিশ বছরের ইতিহাসে সকল সফলতা ও ব্যর্থতার জন্য কেবল স্তালিনই দায়ী। স্তালিনই বিশ বছরের সোভিয়েত ইতিহাসের কারিগর। সোভিয়েত জনতা ছিল কেবলমাত্র  ইতিহাসের পশু খাদ্য আর সিপিএস ইউ ছিল আতঙ্কিত  মৌন ছায়া ।

ভিক্টর হুগো ঐতিহাসিক বস্তুবাদি ছিলেন না। তাই ,ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে পর্যালোচনার ক্ষেত্রে তার বিশ্লেষণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ক্রুশ্চেভ মিকোয়ান গোষ্ঠী কমিউনিস্ট ফলে তারা ঐতিহাসিক বস্তুবাদি এমনটা আশা করাই যায়। যাইহোক, স্তালিনের ভুমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে তারা বুর্জোয়া আদর্শের চর্চাকারিদের সমকক্ষ হয়েছেন ফলে তাদের বিচারধারা হয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সংক্ষেপে সিপিএসিউ এর বিংশতি কংগ্রেস স্তালিন মূল্যায়নে মার্ক্সবাদি বিচারধারাকে পরিত্যাগ করেছে।

সিপিএসিউ এর স্তালিন মূল্যায়ন মার্ক্সবাদের দুটি মৌলিক প্রশ্নের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সাংগঠনিক ক্ষেত্রে   স্তালিন লেনিনীয় সংগঠন নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে বুর্জোয়া সামরিক স্বৈরতন্ত্রের এবং  চিন্তায় ও  কাজে ব্যক্তিচিন্তার আশ্রয় নিয়েছেন- এটা  বিগত বিশ বছরের একটা দিক।

বিগত বিশ বছরের অন্য দিকটা কি? বিগত বিশ বছরে  বিড়াট সাফল্য এসেছে জীবন দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন শিল্পোন্নত দেশসমূহের মধ্যে দ্বিতীয় এবং ইউরোপের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।  শিক্ষা,স্বাস্থ, বিজ্ঞান, কলা কৃষ্টি সকল ক্ষেত্রে বিকাষ ও অগ্রগতি ঘটেছে। রাজনৈতিক,সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শোষণমুক্ত শ্রেণীহীন সমাজ( বিরোধাত্নক শ্রেনী অর্থে) নির্মান করেছে। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে সাম্যবাদের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল । নামকরা পণ্ডিত রোঁমা রোলা , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ,হেইস জি ওয়েলস (, H.G. Wells) ,বার্নার্ড শ, হেউলেট জনসন, এমিল লুডভিগ, অয়েবস প্রমুখ ব্যক্তিগণ সোভিয়েত ইউনিয়নের সামগ্রিক অবিশ্বাস্য অগ্রগতিতে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সাম্রাজ্যবাদি সাগরে সোভিয়েত ইউনিয়ন যেখানে একটি দ্বীপের মত  সেখানেই একটি বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যাবস্থার পুর্ন বাস্তব অবস্থা বিরাজ করছিল।

এভাবেই দীর্ঘ বিশ বছর ধরে একদিকে প্রধানত আমরা মার্ক্সবাদের রাজনৈতিক, সামাজিক অর্থনৈতিক নীতিসমূহের সফল অভ্রান্ত কার্যকরি প্রয়োগ দেখি অন্যদিকে লেনিনীয় সাংগঠনিক নীতি থেকে মৌলিক ও প্রাথমিক বিচ্যুতি দেখতে পাই, নীতিসমূহের বিকৃতির প্রচেষ্টা এবং সমাজে এবং পার্টির মধ্যে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা, যৌথ নেতৃত্বের জায়গায় স্বৈরতন্ত্র ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের প্রচেষ্টা  দেখতে পাই।

সঙ্গত কারনেই জিজ্ঞাস্য এটা কি করে সম্ভব? রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতিতে যে সাফল্য সেটা কি সাংগঠনিক ও সমাজ জীবনে প্রতিফলিত হয় না? রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অগ্রগতির যৌক্তিক অনুসিদ্ধান্ত হচ্ছে সাংগঠনিক গণতন্ত্র এবং সমাজ চেতনার বিকাষ । রাজনৈতিক,সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়ার যৌক্তিক অনুসিদ্ধান্ত হচ্ছে সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়া, উদ্যোগহীনতা ,উ্দাসীনতা, নির্জীব এবং নিরানন্দ  জীবনধারা (routine)। এমন একটি সমাজে জীবন সঙ্গীত প্রতিধ্বনিত হয় না। কিন্তু আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নে সেই সঙ্গীত শুনেছি। প্রশ্ন উঠে- মার্ক্সবাদি  লেনিনবাদি  রাজনৈতিক সাংগঠনিক লাইন কোন বিমুর্ত পারস্পরিক স্বতন্ত্র স্বাধীন ঘটনার( phenomena) বিবিধ সংগ্রহ নয় যা মিথস্ক্রিয়া করে না বা একে অপরকে বর্জন করে বরং এটি সকল কিছুর সম্মিলন, বহু দিক ব্যপ্ত করে সংগবদ্ধ আদর্শ ও অনুশীলন।  যদি তাই হয় তাহলে কি করে দীর্ঘ বিশ বছর ধরে  রাজনীতি ও সংগঠন দুই বিপরীত দিকে অবস্থান করে যেখানে রাজনীতিকে সফলভাবে পরিপুর্নতার হাতিয়ার হচ্ছে সাংগঠনিক নীতিমালা।  সাংগঠনিক রক্ষনশীলতা যেমন রাজনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে তেমনি  রাজনৈতিক রক্ষনশীলতা সাংগঠনিক ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে- আর এই দ্বন্দ্বেই সংগঠনের পরিবর্তন হয় পরিবর্তনটা হয় এর নিয়মের মধ্যে।  এভাবেই সাংগঠনিক নীতি রাজনৈতিক অগ্রগতির সাথে ঐকতান তৈরি করে এবং এটাকে বাধাগ্রস্ত করে না।  কিন্তু যেখানে সাংগঠনিক নীতি এবং কর্মপদ্ধতি রাজনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে সেখানে রাজনীতি যেমন আগায় না তেমনি সংগঠনও পিছিয়ে পরে। (The conservatism of organisational policy acts as a brake in  political progress, similarly political conservatism also acts as a brake on organisational progress – it is in this contradiction that the organisation changes, there are changes made in its rules. In this way organisational policy comes into consonance with political progress and does not impede it. But where organisational policy and method of work impede political progress – there politics does not move forward and the organisation also remains backward.)

 

এভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়নে রাজনীতি এগিয়ে যাচ্ছিল, বড় বড় সফলতা অর্জিত হচ্ছিল কিন্তু দীর্ঘ বিশ বছর ধরে সংগঠন এবং সাংগঠনিক নীতি পিছনে পড়ে ছিল- মহান ঐতিহাসিক পরিবর্তনের যুগে এটা পুরোটা অসম্ভবই মনে হয়। তাহলে কি আমাদের ধরে নিতে হবে সমাজ নিজ গতিতে সংকল্পে এগিয়ে যাচ্ছিল? এই প্রক্রিয়ায় কি মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভুমিকা নেই? সমাজ কি নিয়তি দ্বারা পরিচালিত এবং মানুষও কি নিয়তির হাতে পুতুল? রাজনৈতিক স্বত্ত্বা তার ধরণ ও চরিত্র প্রতিফলিত হয় সাংগঠনিক নীতি, কার্যক্রম, ধরণ ও চরিত্রের মধ্যে। সংগঠন ও সাংগঠনিক নীতির  রূপ ও চরিত্র  প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক রূপ ও চরিত্রের রূপে।

এটা মার্ক্সবাদ হলে ক্রুশ্চেভ-মিকোয়ানের রিপোর্টটি নয়। হয় সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নি, জীবনের কোন ক্ষেত্রেই আগ্রগতি ঘটে নি এমনকি আজকের সময়েও নয় বরং সোভিয়েত ইউনিয়ন একটা বিশাল জেলখানা অথবা ক্রুশ্চেভ- মিকোয়ানের রিপোর্ট ভুল –এটা মার্ক্সবাদ অনুসারে রচিত নয় এবং উন্নত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয় নি। তাছাড়া অন্য আর একটা বিকল্প দাঁড়ায় যে ক্রুশ্চেভ-মিকোয়ানের রিপোর্ট সঠিক হলে  মার্ক্সবাদ ভ্রান্ত ।

ক্রুশ্চেভ-মিকোয়ানের রিপোর্ট যে দ্বিতীয় মৌলিক প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত তা হল ব্যাক্তির ঐতিহাসিক ভুমিকাজনিত প্রশ্ন।

জনতা, পার্টি, কেন্দ্রিয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর সাথে তার কোন যোগাযোগ ছিল না। তিনি কখন কেন্দ্রিয় কমিটি বা পলিটব্যুরোর সভা আহবান করেন নি। একাই সিদ্ধান্ত নিতেন এবং সে মোতাবেক ইস্যু করতেন।

জনগণ, পার্টি এবং সমস্ত কিছুকে অস্বীকার করে , সমালোচনা পর্যালোচনার সুযোগ বন্ধ করে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বাধীন চিন্তাদর্শন, তত্ত্ব এবং কর্মপদ্ধতির উপর ভিত্তি করে যদি  কোন একক ব্যক্তি যখন কিনা গোটা বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এর বিরুদ্ধে অবস্থানরত একটা ব্যাপক পিছিয়ে পড়া সমাজকে উন্নয়ন,সমৃদ্ধি এবং ক্ষমতার এমন উচ্চতায় তুলে আনতে পারে, যদি কেবলমাত্র একক ব্যক্তির তত্ত্বে সমাজতন্ত্র অর্জিত হয়ে সাম্যবাদের দিকে  অগ্রসর হয় ,একক ব্যক্তির নীতি , কার্যপদ্ধতি ও তত্ত্বের ভিত্তিতে সমাজতন্ত্র যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী হয়ে সাম্রাজ্যবাদকে পরাস্ত করতে পারে তাহলে বলতেই হবে মার্ক্সবাদ ভুল, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ভুল। তাহলে কেনইবা যৌথ নেতৃত্ত্ব ও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার উপর এত জোর কেনইবা ব্যাক্তিপুঁজাবাদের বিরুদ্ধে এত হুঙ্কার? জনতার উপরে অধিষ্ঠিত হয়ে তাদেরকে ইতিহাসের আস্তাকূড়ে ফেলে দিয়ে যদি কোন একক কতৃত্বশালী ব্যাক্তি সামাজতন্ত্রের ঊজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করতে পারে তাহলে তার সর্বোত্তম প্রকাশ হবে স্বয়ং স্তালিন। স্তালিন সমস্ত চুলচেরা তাত্ত্বিক যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে তার কাজের মাধ্যমে ঐতিহাসিক বস্তুবাদকেই অস্বীকার করেছে।এখন আমরা আদর্শবাদিদের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে পারি বিশাল জনগোষ্ঠী শুধুমাত্র ইতিহাসের কাচামাল হিসাবেই কাজ করে। বিশাল ব্যাক্তিত্বই সমস্ত কিছু, বিশাল জনগোষ্ঠী কিছুই না।

সুতরাং ক্রুশ্চেভ-মিকোয়ান রিপোর্ট সঠিক হলে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ ভুল, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ভুল।

ক্রুশ্চেভের রিপোর্ট অনুসারে সোভিয়েত ইউনিয়নের অসংখ্য সফলতার জন্য সোভিয়েত জনগনের অতুলনীয় আন্তত্যাগ ও দেশপ্রেমের ভূয়সী প্রসংসা থাকলেও সমস্ত ব্যর্থতার জন্য স্তালিনকেই দায়ী করা হয়েছে।

ফ্রেন্সরা যেমন বলে থাকে তাদের জাতি অকস্মাৎ হাতছাড়া হয়ে গেছে এক্ষেত্রেও এমনটা বলা অত্যুক্তি হবে না। জাতি এবং নারী অরক্ষিত প্রহরে  রক্ষা পায় না যে সময় ধরে প্রথম অভিযাত্রিক আসে সে সবকিছু তছনছ করে দিতে পারে। এরকম কথার ফেরে ধাঁধাটির সমাধান হয় না কিন্তু শুধুমাত্র অন্যভাবে একে রূপ দেয়া যায়। এখনও ব্যাখ্যার দাবি রাখে কি করে ৩৬ মিলিয়ন মানুষের জাতি হতভম্ব হয়ে বিনা বাধায় উচ্চ শ্রেনির তিন প্রতারকের কারনে  বন্দিত্ব মেনে নেয়। (It is not enough to say, as the French do, that their nation has been taken by surprise. A nation and a woman are not forgiven the unguarded hour in which the first adventurer that came along could violate them. The riddle is not solved by such turns of speech, but merely formulated in  another way. It remains to be explained how a nation of thirty-six millions can be surprised and delivered unresisting into captivity by three high class swindlers. (K. Marx and F. Engels,Selected Works, Vol. 1, Bombay, 1944, p. 298).

মার্ক্স বোঝাতে চেয়েছেন যে কেবল গুটিকয়েক মানুষ এত বড় দেশকে ভুলপথে চালিত করতে পারেনা এবং শুধুমাত্র তাদের কাঁধে দোষ চাপিয়ে  কেউ দায় এড়াতে পারে না। উপরের বাক্যবন্ধের মাধ্যমে কার্ল মার্ক্স ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া ঘটনার ঐতিহাসিক বাস্তবতা তুলে ধরে পান্ডিত্যপুর্ন বিশ্লেষণ রাখলেন। এটিই নির্দিষ্টভাবে ঐতিহাসিক বস্তুবাদী বিচারধারা। অর্থাৎ মূল বিচারধার আলোকেই বিশ্লেষণ করতে হবে সমকালীন সমাজের গতিধারা এবং সফলতা, ব্যর্থতা, অর্জন, ঘাটতি এবং ব্যাক্তির ভুমিকা ও অবদান। ব্যাক্তির ভূমিকা ইতিহাসের আলোকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে মার্ক্সবাদের মৌলিক নীতি আর ব্যাক্তিকেন্দ্রিক অবস্থান থেকে পর্যলোচনা করা হচ্ছে মার্ক্সবাদ বিরোধী বুর্জোয়া ভাবধারা ।

সেটাই  মার্ক্সবাদী এবং ক্রুশ্চেভ গোষ্ঠীর মধ্যে মৌলিক চিন্তার পার্থক্য।

সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যাবস্থার সীমাবদ্ধতা ঘাটতির খবর নিতে গেলে জানা যাবে কি উচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে সোভিয়েত ব্যাবস্থাকে এবং জনতাকে যারা সমস্ত দিক থেকে বিজয়ের মনোভাব নিয়ে উন্নয়ন অগ্রগতি ঘটিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের অসম বিকাষের কারনেই এক দেশে সমাজতন্ত্র সম্ভব আর সোভিয়েত ইউনিয়নই তার প্রমাণ। কিন্তু এক দেশে সমাজতন্ত্র মানে বিশাল সাম্রাজ্যবাদী সাগরে এক ফোঁটা জল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয় এবং কতিপয় দেশে জনগণতান্ত্রিক রাস্ট্রের  অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বদা আভ্যন্তরিন বা বাহ্যিক উভয় ক্ষেত্রে যুদ্ধাবস্থায় ছিল। একক দেশে যে এত দীর্ঘ সময় ধরে সমাজতন্ত্র গন্ডিবদ্ধ থাকবে সেটা লেনিন বা সমকালীন কোন কমিউনিস্ট নেতা ভাবতে পারেন নি। ইতিহাস যে বস্তুভিত্তি পরিবেষণ করে তাকে নিয়েই মানুষকে সমাজে  এবং পৃথিবীতে কাজ করতে হয় এভাবেই সমাজ পৃথিবী এগিয়ে যায় নতুন ইতিহাস সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। ইতিহাস কারো শুভ ইচ্ছা এবং মোহাচ্ছন্ন ভাবনা ও স্বপ্ন দিয়ে তৈরি হয় না। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা যে দীর্ঘকাল পুঁজিবাদ পরিবেষ্টিত যুদ্ধাবস্থায় ছিল সেটা তার ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতার কারনেই ছিল।

সকল রাজনৈতিক , সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব জনতার উপর  ধাপে ধাপে ছেড়ে দিয়ে রাষ্ট্রের অবদমনের বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক রূপকে সামাজিকভাবে  ধাপে ধাপে অপ্রয়োজনীয় করে ফেলাটা মধ্যবর্তি সমাজতান্ত্রিক রাস্ট্র এবং শ্রমিক শ্রেনীর একনায়কত্ত্বের একটি মৌলিক কাজ। রাস্ট্রের তিনটি প্রধান স্তম্ভ হল- নির্বাহী বিভাগ,বিচার বিভাগ এবং আইন বিভাগ। সমাজতান্ত্রিক রাস্ট্রের অন্তর্বতি পর্যায়ের মোলিক দায়িত্ব হল এই তিন বিভাগের স্থায়ী আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রনে (to keep in check)রাখা সাথে সাথে অবস্থিত সেনাবাহিনী, গোপন পুলিশ,গোয়েন্দা বিভাগ যেগুলো কোন সৃষ্টিশীল উৎপাদন করে না বরং সম্পুর্ন রাস্ট্রের উপর নির্ভরশীল তাদেরকে নিঃশেষ করে ফেলা। স্থায়ী আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে জায়গা করে নিবে জনগণ কতৃক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সেনাবাহিনীর পরিবর্তে সশস্ত্র জনতা যারা বেঁচে থাকার জন্য রাস্টের উপর নির্ভর করবে না। একমাত্র তখনই জনগনের স্বাধীন মতামত তৈরি হবে এবং একমাত্র তখনই তাদের মতামত প্রকাশ করার যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ রাস্ট্র তাদের সাথে দলের সভ্যের সাথে যে আচরণ করে তা করতে পারবে না।

এই দীর্ঘ সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে এগুলোর কোনটাই সম্পন্ন করা সম্ভব হয় নি। সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা পরিবেষ্টিত থেকে এখন আক্রমনের হুমকির মধ্য থেকে এক দেশে সমাজতন্ত্রকে রক্ষার প্রয়োজনে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত রাস্ট্রের উপর নির্ভরশীল বিরাট সুশিক্ষিত বাহিনীর প্রয়োজন রয়ে গেছে। এক দেশে সমাজতন্ত্রকে দ্রুত এগিয়ে নিতে,  এরকম একটি বিশাল ও অনুন্নত দেশের জন্য উন্নত পুঁজিবাদী রাস্ট্রের শুধু কাছাকাছি যেতে নয় তাদের অতিক্রম করার প্রয়োজনীয়তা ছিল ফলে কেন্দ্রিকতার উপর অতিরিক্ত জোর পরে গিয়েছিল। পরবর্তিতে একই কারনে  দক্ষ, আত্ন-উতসর্গের মনোভাবাপন্ন,আদর্শবান( দার্শনিক অর্থে নয়),কর্মঠ, যারা রাস্ট্রে, শিল্পে,কৃষিতে পার্টির প্রতি অনুরক্ত তাদের নিয়ে এক বিশাল বাহিনী গড়ে তোলা এবং তাদের উপর নির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল।

সেনাবাহিনী, গোপন পুলিশ,গোয়েন্দা বিভাগ যেগুলো কোন সৃষ্টিশীল উৎপাদন করে না বরং সম্পুর্ন রাস্ট্রের উপর নির্ভরশীল তাদের উপস্থিতি সমাজে সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিড়াট বাঁধা।  যারা জনগণের জীবনযাত্রার সাথে বা উতপাদনের সাথে  কোন যোগাযোগ  রাখে না সেই নথি ঠেলা আমলাতন্ত্রও (file-pushing bureaucracy) সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিড়াট বাঁধা।   সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিড়াট বাঁধা।   এইভাবে একদিকে  সোভিয়েত ইউনিয়নে সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে, শিক্ষায় সংস্কৃতিতে এক অভূতপূর্ব উন্নতি ও অগ্রগতি দেখতে পাই  ,দেখতে পাই শ্রেণীহীন ( বিরোধাত্নক অর্থে) শোষণমুক্ত সামাজিক ব্যাবস্থা অন্যদিকে রাস্ট্রে এবং রাস্ট্রযন্ত্রে ছিল অত্যধিক কেন্দ্রিকতা ও আমলাতন্ত্র। এই দ্বন্দ্বটি নিহিত ছিল সোভিয়েত সমাজের জাতীয় ও সামাজিক বিকৃতির মূলে। মনে রাখতে হবে অগ্রগতির প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের  সামনে বিকল্প কোন পথ ছিল না। কেউ যদি আন্দ্রে জিদের( Andre Gide) মত  মোহ নিয়ে সমাজতান্ত্রিক রাস্ট্র পরিদর্শন করতে যায়, তাহলে তার স্বপ্ন ভেঙ্গে যেতে বাধ্য।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যর্থতার বিশ্লেষণে এতটুকু বলা যথেষ্ট নয় যে এটি   সমাজের লক্ষ মানুষের  পারস্পরিক সাংঘর্ষিক ভাবাদর্শ ও কার্যক্রমের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফল। মানুষ কেবলমাত্র ইতিহাসের পর্যবেক্ষক নয়। সে সরাসরি তার ক্ষমতা  শক্তি ইতিহাস সৃষ্টিতে ব্যাবহার করে। এখন পর্যন্ত ইতিহাস সৃষ্টিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ এভাবেই অবদান রেখেছে। এটি প্রত্যক্ষ অবদান হলেও সচেতন নয়। যে বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি হয় লক্ষ মানুষের পারস্পরিক সাংঘর্ষিক ভাবাদর্শ ও কার্যক্রমের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলে তার মৌলিক গতি ও বিকাষকে যে  ব্যাক্তি বা সংগঠন মূলগতভাবে বুঝতে পারে এবং সচেতনভাবে ঐতিহাসিক লক্ষ্য অর্জনে সমাজকে এগিয়ে নিতে  সংগ্রাম করে তিনি বা সেই  সংগঠনই নেতা। ইতিহাস সৃষ্টিতে ব্যাক্তির যে ভূমিকা মুছে ফেলা যায় না এটি তাই। ফলে ইতিহাসের অনিবার্য অগ্রসরের ডাক দিয়ে সেখানে ব্যর্থতা বা ঘাটতি থাকলে তার জন্য নেতা বা সংগঠন দায় এড়াতে পারে না। ঘটনা ঘটার পর মানুষ শেখে এই যুক্তি প্রচার করে  মিকোয়ানের মত নেতা দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে । এটা লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সত্য হতে পারে কিন্তু আমরা দার্শনিক জ্ঞানের প্রশ্নে আলোচনা করছি। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে প্রতযকে বুঝে। কিন্তু নেতৃত্ব সেখানেই নিহিত যারা ঘটনার আগেই বস্তুর গতি ও বিকাষ পুর্বানুমান করতে পারে বিরুদ্ধ গতি ও বিকাষকে অনুকূলে আনার জন্য সাবলীল ও যথাযথ শর্ত তৈরির জন্য সংগ্রাম করে। এখানেই সুনির্দিষ্টভাবে নেতা ও নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা  এবং এভাবেই যে দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বিকষিত হয়েছে সেক্ষেত্রে আমাদের উপলব্ধি গড়ে তুলতে সহযোগিতা করার জায়গা থেকে।

সুতরাং একদিকে আমরা সমাজতান্ত্রিক সমাজের অগ্রগতি দেখতে পাই অন্যদিকে সেনাবাহিনী,অতিরিক্ত কেন্দ্রিকতা,নির্বাহী ও আইন বিভাগে আমলাতন্ত্র যার ফলশ্রুতিতে সোভিয়েত সমাজে, রাস্ট্রে এবং জীবনে অবশ্যম্ভাবীরুপে ব্যর্থতা ও ঘাটতি এবং বিকৃত বিকাষ( distorted development) সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন আসে  এই ঘটনাসমূহের জন্য স্তালিন কি নেতা হিসাবে যথেষ্ট সজাগ ও সতর্ক ছিলেন এবং অনুকূল শর্তের জন্য সংগ্রাম করেছেন কিনা? শুধু এতটুকু মাত্রা পর্যন্ত তাকে দায়ী করা যায় কোনভাবেই সকল ব্যার্থতা ঘাটতির জন্য তাকে দায়ী করা যায় না। সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সোভিয়েত সমাজের বিকাষ কিছুটা বিকৃত ও একপেশে হতে বাধ্য ছিল- এই সত্যটুকু ঢেকে রাখার কোন কারন নেই। কিন্তু গুরুত্বপুর্ন প্রশ্ন হল এই একপেশে অবস্থানকে মোকাবেলায় কতটুকু প্রচেষ্টা ছিল এবং এক্ষেত্রে কেবল দায় বর্তানোর প্রশ্নটি আসে।

ক্রুশ্চেভ মিকোয়ান চক্র যদি ব্যক্তি ও রাস্ট্রের ব্যর্থতা ও ঘাটতি বিশ্লেষণে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মূলনীতিকে গ্রহন করত তাহলে স্তালিন এবং সমাজতন্ত্রকে বিশ্বের সামনে কলঙ্কিত  করতে পারত না। তারা ব্যক্তিগত আক্রমণ করত না। কারণ এটা তাদের বুর্জোয়া ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিশ্লেষণ ফলে  তাদেরকে মিথ্যাচার এবং বিকৃত ইতিহাসের আশ্রয় নিতে হয়েছে।

কিন্তু মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ অজেয়। ব্যাক্তির শুভ ইচ্ছা নিরপেক্ষভাবে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের কার্যকারিতা আছে। ইতিহাস  ঐতিহাসিক বস্তুবাদের নীতিকে এবং অবশ্যই স্তালিনের যথার্থতা ও অবদানকে ঘোষণা করবে ।

 

 

 

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s