পুঁজির সহজ পাঠ

                                        

অধ্যায় ১ঃ পণ্য

১। পণ্যের দুটি রুপঃ ব্যাবহারিক মূল্য মূল্য

পুঁজিবাদি উৎপাদন পদ্ধতিতে সম্পদ টিকে থাকে বিশাল পণ্য সম্ভার হিসাবে( immense collection of commodities)। আর প্রত্যেকটি একক পণ্য এর প্রাথমিক রুপ। তাই পণ্য বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই অনুসন্ধান শুরু।

পণ্য কি? ঃ যে দ্রব্য/ জিনিস তার গুনে মানুষের যে কোন চাহিদা পূরণ করে তাই পণ্য।

ব্যাবহারিক মূল্যঃ একটি বস্তুর উপকারিতা বা উপযোগিতাই হল সেই বস্তুর ব্যাবহারিক মূল্য( use value)। কিন্তু এই উপযোগিতা বিষয়টা আকাশে ঝুলে থাকে না। এটি পণ্যের বস্তুগত গুণের উপর নির্ভর করে। যেমন, একটি হাতুরি। তার মাথায় ভারী লোহা ও ধরার জন্য হাতল থাকায় এটি দিয়ে ইট ভাঙ্গা যায়। বা একটা লুঙ্গি যা মানুষের লজ্জা নিবারণ করে। এবং দশটা হাতুড়ির সাহায্যে দশ জন শ্রমিক কাজ করতে পারে মানে একটা হাতুড়ির চেয়ে দশটার ব্যাবহারিক মূল্য বেশি। আর  আমরা যখন ব্যাবহারিক মূল্যের পরীক্ষা করি তখন সুনির্দিষ্ট পরিমাণের কথা ভাবি। যেমন এক ডজন ডিম/ কলা ইত্যাদি। এখানে জেনে রাখা ভাল যে ব্যাবহারিক মুল্য উপভোগ করার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমের আলচনার দরকার পড়ে না। আর একটা কথা মাথায় রাখা উচিত যে আমরা যখন সম্পত্তির কথা বলি তখন অনেক কিছু ভাবতে পারি। যেমন টাকা, সোনা , ঘর বাড়ি, আলু পটল ইত্যাদি। মানে উপকারিতা/ উপযোগিতা আছে এমন কিছুকেই চিন্তায় আনি। অর্থাৎ সম্পত্তি বিষয়টার বস্তুগত ভিত্তি( material content of wealth)  থাকে ব্যাবহারিক মূল্যের উপর।

বিনিময় মূল্যঃ যে পরিমাণ বা অনুপাতের সম্পর্কে এক ধরণের ব্যাবহারিক মূল্য আর এক ধরণের ব্যাবহারিক মূল্যের সাথে বিনিময় করা যায় তাই বিনিময় মূল্য( exchange value)। উদাহরণস্বরূপঃ একজন দিনমজুর বাজারে গিয়ে একটা মুরগী বেঁচে তিন কেজি চাল কিললেন। তার মানে- একটি মুরগীর ব্যাবহারিক মূল্য সমান তিন কেজি চালের ব্যাবহারিক মূল্য । তবে স্থান কালে এই সম্পর্ক পাল্টে যেতে পারে। খেঁয়াল করলেই দেখা যাবে বস্তুর মধ্যে বিনিময় মূল্য ব্যাপারটা একটা অ্যাকসিডেন্টের মত যেন বস্তুর মধ্যে আগে থেকেই ছিল মনে হয় যাকে সহজাত বলে। অর্থাৎ পণ্যের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু বিষয়টাকে বিরধাত্নক মনে হয়। কারণ কোন কিছুর মূল্য সহজাত হতে পারে না। কিংবা একটা জিনিসের মূল্য ততটুকুই যতটুকু সেটা বহন করে। একটু জটিল হয়ে গেল মনে হয়। যাইহোক, পণ্য উৎপাদনে শ্রম আলোচনা করলে আশা করি বুঝতে সুবিধা হবে। এখন বিনিময় মূল্যের আরো কিছু দিক বুঝার জন্য আরো কিছুটা বাড়তি আলোচনা করি।

ধরা যাক, ১ মণ ধান বেঁচে একটা মাছ ধরার জাল বা ২ মণ গরুর খাবার বা ২ টি শাড়ি কেনা যায় মানে এক মণ ধানের বিনিময় মূল্য একাধিক এবং জালের সাথে গরুর খাবার বা গরুর খাবারের সাথে শাড়ি বিনিময় করা সম্ভব। তার মানে একটি পণ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণ দিয়ে আর একটি পণ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণ বিনিময় করা যায়। অর্থাৎ বিনিময় মূল্য ব্যাপারটা সমান কিছু প্রকাশ করছে। এবং এটি প্রকাশের এমন একটি ধরণ যা দিয়ে বস্তুর মূল সত্তাকে আলাদা করে দেখা যায়।

এই যে দুটি বস্তু বিনিময় মূল্যের মাধ্যমে সমান তা আসলে ৩য় আর একটি জিনিসের সমান। যেমন, তিনটি সরল রেখা দিয়ে ত্রিভূজ বানালে যে ক্ষেত্রফল হয় তা কিন্তু সম্পুর্ণ ভিন্ন তৃতীয় আর একটি জিনিসে পর্যবসিত। কিন্তু পণ্যের ক্ষেত্রে এর সাধারণ উপাদানটি কোনভাবেই জযামিতিক বা রাসায়নিক বা প্রাক্রিইতিক কিছু নয় বরং বস্তুর ব্যাবহারিক মূল্যের বিমুর্ত ( abstract) রুপ। এই বিষয়টিও শ্রম আলোচনার সাথে আরো সহজ হওয়ার কথা।

মানব শ্রমঃ বস্তুর মধ্যে ব্যাবহারিক মূল্য বাদ দিলে যা থাকে তা হল শ্রম। মূর্ত বস্তু চেয়ার , টেবিল জাতীয় কোন ব্যাবহারিক মূল্যই বোধগম্য হবে না যদি না মানব শ্রমকে বিবেচনা না করি। তাই দেখা যাচ্ছে যে শ্রমের কারণে বস্তুর  ব্যাবহারিক মূল্যের বাইরে  আর একটা মূল্য আছে। আর এই পণ্যের মূল্য নির্ভর করে তাতে কতটুকু শ্রম নিযুক্ত হল তার উপর। সাধারনত ঘন্টা বা দিনের হিসাবে শ্রমের পরিমাপ করা হয়।

কিন্তু একই পণ্য তৈরীতে দক্ষতা- অদক্ষতার কারনে এক এক জনের এক এক সময় লাগলে ঐ পণ্যের ভিন্ন ভিন্ন মূল্য তৈরী হয় না বরং একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সমাজে একটাই মূল্য তৈরী হয়। আর সেটা ঐ সমাজের প্রয়োজনীয় গড় শ্রম সময়ের(Necessary average labor time)  উপর নির্ভর করে। প্রয়োজনীয় গড় শ্রম সময় ব্যাপারটা সামাজিক স্বীকৃতির ব্যাপার।   যেমন কোন সমাজে ১ বিঘা জমিতে ধান রোপণ করতে ১০ জন ক্ষেতমজুরের গড়ে ১ দিন লাগে । সেখানে যদি ১০ জন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত যুবক শখের বশে মনের আনন্দে কবিতা লেখার মত শিল্প সম্মত উপায়ে রোপন করে ১০ দিন লাগায় তাতে সমান সংখ্যক মানুষের বেশি শ্রম সময় লাগার কারনে উক্ত পণ্যের মূল্য বেড়ে যায় না বরং সে অঞ্চলের যে গড় শ্রম সময় ১ দিন তাই মুল্য নির্ধারণ করে।

 প্রয়োজনীয় গড় শ্রম কোন স্থির ধারনা নয়- এটি উঠা নামা করতে পারে উতপাদন ক্ষমতার নিরিখে। যেমন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফলে মানুষ যন্ত্রের সাহায্যে কম সময়ে উৎপাদন করতে শিখেছে। ফলে যত বেশি উৎপাদন ক্ষমতা তত কম সময়ে একটি পণ্য তৈরী সম্ভব এবং সেই পণ্যের মূল্য তত কমে যাওয়া। কয়েক টন কয়লা তুলতে যে পরিমাণ শ্রম লাগে তার চেয়ে অনেক বেশি শ্রম সময় লাগে এক টুকরা হিরা উৎপাদনে  এবং সেকারনেই কয়লার মূল্যের চেয়ে হিরার মূল্য অনেক।

আবার ব্যাবহারিক মূল্য থাকলেই যে বিনিময় মূল্য থাকবে তা নয়। যতক্ষণ না শ্রম যুক্ত হয় ততক্ষণ কোন বস্তুর মূল্য থাকে না। তাই, বাতাসের ব্যাবহারিক মূল্য থাকলেও বিনিময় মূল্য বা মূল্য থাকে না।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s