বিশ্বকাপের ভৌগলিক রাজনীতি মূল লেখা – পেপে এসকোবার, এশিয়ান টাইমস, ১২ জুন, ২০১৪ অনুবাদ – মতিন সরকার , ১ জুন, ২০১৫

                           

                      
১৫০০ সালে ব্রাজিল নামক যে জায়গা আবিষ্কৃত হয়েছিল তার কয়েক শত মিটার অদূরে জার্মান দল প্যাটাক্সো ইন্ডিয়ান্দের সাথে যে ভাতৃত্ব গড়ে তুলেছে তা বিশ্বকাপের জন্য একটা সংজ্ঞা নির্ধারকারি  প্রতিচ্ছবি। এটিকে ইউরোপিয়ানদের ক্রান্তীয় অঞ্চল পূনঃআবিস্কারঃবলা যায়।  তারপর সমুদ্র ধারে সুগারলোফ পর্বতের কিনারে  সৈন্য ঘাটির মধ্যে ইংরেজদের মজা করে বেড়ানো দারূন একটা আবহ । সবশেষে শনিবার গভীর আমাজন জঙ্গলের  ভিতরে ইতালির বিরুদ্ধে গর্জন শোনাগেল।
দুনিয়ার সর্ববৃহৎ প্রদর্শনি বিশ্বকাপ ক্লান্তিহীনভাবে রাশিয়া ও চিনবিরোধী প্রচার চালিয়ে তাদের যে কুৎসা করে বেড়াচ্ছে তা এখন হিস্টেরিয়ার পর্যায়ে চলে গেছে।  আর এর মানেই হচ্ছে ব্রিকসকে লক্ষ্য করা কেননা ব্রাজিল আমাজন জঙ্গলের বিড়াট অংশ জুড়ে প্রগতিশীল লাতিন আমেরিকার সাথে সংহতি জ্ঞাপন করে মনরো মতবাদকে টয়লেট পেপার বানানোর সাহস দেখিয়েছে।

সম্প্রতি ব্রাজিল ৩০ মিলিয়ন মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করেছে। চিন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করেছে। মদমত্ত ইয়োলেতসিনের আমলের মত রাশিয়া আর ভয় পেয়ে পীড়ণের শিকার হতে চায় না। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বকাপ মানে ব্রিকসঃ ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা, এখন ব্রাজিল আর ২০১৮ সালে রাশিয়ায়। ২০২২ সালে কাতারে হলে তা হবে উপসাগরীয় তেলের পয়সায় ঘুষের কারবার।
মজার ব্যাপার লন্ডন রাশিয়ার  টাকাকে ভালবাসে, চিনের বিনিয়োগ কামনা করে আর ব্রাজিলের মৃদু শক্তিকে সহ্য করে। সবকিছু নিয়ে ব্রিটিশ তাদের রসিকতা দিয়ে জঙ্গলের ভিতরে গর্জন যেটা ন্যাটো অনেক লালসা নিয়ে মাঝ জঙ্গলে শুরু করেছে( পানির জন্য যুদ্ধ) তা  সহজে ব্যাখ্যা করতে পারবে ।
 

 

অন্য বিশ্বকাপ  

জি ৭৭+ চিন শীর্ষ সম্মেলন বাস্তবে যেখানে জাতিসংঘের ১৩৩ সদস্য ছিল, বিশ্বকাপ শুরুর দুই দিন পর ব্রাজিলের প্রতিবেশী বলিভিয়া  হোষ্ট করল। সভাপতিত্ব করলেন ইভো মরালেস।  যে প্যাটাক্সোস জার্মানিদের মুগ্ধ করেছে  তাদেরই দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই মরালেস। এই মিটিঙকে আলবা( আমেরিকায় বলিভারিয়ার বিকল্প সংগঠন) ও ব্রিকসের সমন্বয় বলা যায়।  আমেরিকার আপত্তিকারিরা ক্ষেপে গেছে যে ব্রিকস বহু মেরু বিশ্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফটবল খেলার মধ্যেও তার প্রতিফলন  টের পাওয়া যাচ্ছে। ধরা যাক, একদিকে স্পেন, জার্মানি, ইতালি আর অন্যদিকে ব্রাজিল, আর্জেইন্টিনা ও উরুগুয়ে। শিল্পসমৃদ্ধ উত্তরের প্রভাবের বিরুদ্ধে  দক্ষিণ-দক্ষণের যে আঘাত ফটবলেও তা জারি আছে। ব্রাজিল, চিন রাশিয়া ভিন্ন ভিন্ন কৌশল থেকে দক্ষিণ –দক্ষিণ সংহতিতে দক্ষিণের ব্যাংক যেটি আগামিতে ব্রিকসের উন্নয়ন ব্যাংক হিসাবে গন্য হবে সেখান  থেকে বাজি ধরছে।

জি ৭৭ যে উপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে , কোন সাম্রাজ্যের ভিত্তিতে নয় এবং এন এস এ সমন্বিত নজরদারিসূলভ কোন হস্তক্ষেপের জন্য উন্মুক্ত দক্ষিণ দুনিয়া নয় তা স্মরণ করা খুব বেশি বলে কখন গন্য হবে না।

. এখন আসা যাক ফিফা অনুমোদিত আমোদ প্রমোদের জন্য নির্ধারিত স্পন্সরের দিকে । স্পনসেরসিপের শীর্ষে যেগুলি আছে সেগুলি হল অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, হুয়ান্ডাই, মটরস, সনি, ভিসা, বাডওয়াইজার, ক্যাস্ট্রল, কন্টিন্যান্টাল, জনসন  এন্ড জনসন   যেগুলি এবার বিজ্ঞাপণ যুগের ইতিহাসকে ভেঙ্গে দিয়েছে।

অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে দক্ষিন-দক্ষিণের নানা সংগঠন, সংহতি জ্ঞাপন ,সামাজিক আন্দোলন যারা পুঁজিবাদ পরবর্তি নব্য উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছে,  দাড়িয়েছে  গরিবের প্রতি  অপরাধের বিরুদ্ধে । কঠোরভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের সকল কিছুকে অভিযুক্ত করে তাদের  বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।  এবং এটা বিস্ময়কর নয় যে এই আন্দোলের মাঝে দক্ষিণ জগতের নায়ক, ঈশ্বরের  হাত বলে পরিচিত দিয়াগো ম্যারাডনাকে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। তিনি মন্তব্য করেছেন যে ফিফা পাবে ৪ বিলিয়ন ডলার আর বিজয়ী জাতি পাবে ৩৫ মিলিয়ন ডলার।কিন্তু পরিসংখ্যানটা ভুল। বাস্তবে, করপোরেট বানিজ্য ফুটবলের মৃত্যু ঘটাচ্ছে।
.

ফুটবল একটি যুদ্ধ

পুঁজিবাদি বিশ্বায়নকে যেভাবে বিশ্বকাপ ফুটবলের মাধ্যমে চিত্রায়িত করে দেখানো হয়েছে তার সাথে সমান্তরালভাবে  এসেছে সমসাময়িক বিড়াট বানিজ্য ও জাতিয়তাবাদ। তবে জগত কখন সমান ছিল না বা হবেও না।  হিমালয়, পামির বা হিন্দু কুশের মত এর ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতা, বরফ ধ্বসের মত ব্যবসা ,বাণিজ্য, অভিবাসীর আগমন ও প্রযুক্তির উঠানামার উপর রাস্ট্রের অবস্থান নির্ভরশীল।  এগুলির কোন কিছুই জাতীয় উপাদানকে নষ্ট করতে পারে না। এটি এখন আমাদের বিরুদ্ধে -তোমরা তোমাদের বিরুদ্ধে আমরা।

ফুটবলের ক্ষেত্রে উত্তর জাতীয়তা বলে কিছু নেই। নিরেট ভূরাজনৈতিক অবস্থান থেকে ভীষণভাবে কেন্দিভুত ইউরোপিয় ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাচ্ছে দক্ষিনপন্থি বা উগ্র দক্ষিনপন্থি জাতীয়তাবাদি দলের কাছে । ভূরাজনিতির সাথে ফুটবলের তুলনা করলে দেখা যায় যে এখানে শুধুমাত্র একটা ব্যতিক্রমী শক্তি বিরাজ করছে তা নয় বরং কয়েকটি শক্তি যেমন স্পেন থেকে  ব্রাজিল, জার্মানি থেকে ইতালি, আর্জেন্টিনা থেকে ফ্রান্স।

যে  ডাচ জাতীয় দল ১৯৭৪ সালে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিল (যদিও তারা জয় পায়নি) তার  কোচ রাইনাস মাইকেল একদা বলেছিলেন যে ফুটবল একট যুদ্ধ। ম্যাভারিক ছিনেমার পরিচালক স্যামুয়েল ফুলার  যেমন বলেছিলেন ছিনেমা হল একটা যুদ্ধক্ষেত্র। বিশ্বকাপ জাতীয়তার সংঘর্ষের নিরিখে যুদ্ধ। তাই খেলাটা হল নিজ নিজ গোত্রকে বেছে নেওয়া। নিজের গোত্র হেরে গেলে আর একটা গোত্রে জোগদান করা । কোন বিলুপ্ত এপিকিউরিয়াসের চেলা ইতালিকে এই ভাগে ফেলবে। তৎসত্ত্বেও তাদের একটা আন্দোলিত করার মত জাতীয় সঙ্গীত  আছে। তারা সেরা খাবার খাবে , পড়বে সেরা কাপড় । তবে অবশ্যই তাদের জাদুকরি  ফটবলার আন্ড্রিয়া পার্লো আছে।

খেলার এক নতুন পদ্ধতি

ফুটবলের দেশ হিসাবে বহুল প্রশংশিত হলেও ব্রাজিল কার্বন নিঃসরণ কমাতে বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভুমিকা নিয়েছে। এমনটাই জানান দিচ্ছে সদ্য প্রকাশিত বিজ্ঞান সাময়িকীগুলি। একই সময়ে দেশটি বনকে রক্ষা করে কৃষি ফলন বাড়িয়ে তুলেছে।

অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে ব্রাজিল এবং এই বিশ্বকাপ পেয়েছে জীবন্ত  মেসি নামক এক রুপককে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ গতানুগতিক আন্তরিক ব্রাজিলবাসীকে আবেদন জানাতে বাধ্য হয়েছেন যেন তারা সহনশীলতা, বৈচিত্র্য , আলোচনা এমনকি স্থিতাবস্থার পক্ষে অবস্থান নেয়।বর্ণবাদ ও সংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি সমালোচনা করেন যেন বিদেশী বিনিয়োগ কোন ভাবে সমস্যার  মধ্যে না পড়ে।

ধরে নেওয়া হচ্ছে যে গড় ব্রাজিলবাসী সাদর সম্ভাষণ জানাবে। কিন্তু যে বিষয়টি বড় ঝামেলা তৈরী করতে পারে সেটি হল নাগরিক স্থানান্তরজনিত যে বড় কাজের জন্য ২ লাখ মানুষকে তাদের বাস্তুভিটা থেকে সরাতে হবে বা সরানোর হুমকি চলছে তা থেকে। বস্তুত দূর্নীতির কারনে এই প্রকল্পের মাত্র ১০ ভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে আর একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হচ্ছে যে রিও শহরে শ্রমিক শ্রেনীর জন্য হযবরল পরিবহন ব্যাবস্থায় কোন বিনিয়োগই হয়নি।

জনপ্রিয় লুলা ২০০৯ সালে ঘোষণা দিয়েছিল যে কোন করপ্রদানকারিরর টাকা বিশ্বকাপে ব্যায় হবে না। বাস্তবে সরাসরি জনতার টাকা উক্ত খাতে ব্যায় না হলেও এসেছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জাতীয় ব্যাংক থেকে । স্টডিয়াম নির্মাঙ্কারিরাও কর ছাড় থেকে বহত লাভবান হয়েছে।

মোদ্দাকথা রুসেফ গণ্মাধ্যম যুদ্ধে হেরে গেছে। বার বার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে বিশ্বকাপ থেকে অর্জিত অর্থের কিছু অংশ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যায়িত হবে। কিন্তু অর্ধেক জনতাও তা বিশ্বাস করেনি। তথাপি এটা সত্য যে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতলে রুসেফ স্বাভাবিভাবে পূনঃনির্বাচিত হবে।

কিন্তু সাম্প্রতিক আন্দোলনের ঢেউ  বর্তমান প্রশাসনকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। মনে হচ্ছে যেন এই বৈচিত্রময় সামাজিক আন্দোলনগুলি একটা চূরান্ত কাল্পনিক ইচ্ছা করেছে যে এক ধাক্কায় শত বছরের অন্যায় দূর করে ফেলবে।

তাই বলা যায় যে সমস্ত নাটকটা শুধুমাত্র নব্যউদারবাদ বা পুঁজিবাদবিরোধী আলোড়ণ নয়। এর অবস্থান জাতীয়তার সীমানা ছাড়িয়ে। এটি বিপ্লবের ছুতা হিসাবে ফটবলকে ব্যাবহার করার পাঠ্যপুস্তককে ছাড়িয়ে যাবে । ফুটবলকে ঘিরে যে ফলাফলই আসুক এখন দক্ষিণ জগতকে কিছু শিক্ষা দেবার বাকি আছে ব্রাজিলের।
জয়লাভে অথবা মহিমাময় পরাজয়েও ব্রাজিল এমন এক অবস্থানে উন্নিত হতে পারে যে সে একটা নতুন, অহমহীন, নব উপনিবেশবাদ বিরোধী, অস্ত্রের দামামা ছাড়া  শক্তির মহড়া দিতে পারে ও নেতৃত্ব দিতে পারে। বহু মেরুর দুনিয়ার জন্য সখা নির্বাচন করতে পারে,  ভুরাজনৈতিক ঐক্যের জন্য কোটারি করতে পারে।  নতুন মহিমাময় খেলাটি তবে হোক শুরু।
.

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s