বিশ্বকাপের ভৌগলিক রাজনীতি মূল লেখা – পেপে এসকোবার, এশিয়ান টাইমস, ১২ জুন, ২০১৪ অনুবাদ – মতিন সরকার , ১ জুন, ২০১৫

                           

                      
১৫০০ সালে ব্রাজিল নামক যে জায়গা আবিষ্কৃত হয়েছিল তার কয়েক শত মিটার অদূরে জার্মান দল প্যাটাক্সো ইন্ডিয়ান্দের সাথে যে ভাতৃত্ব গড়ে তুলেছে তা বিশ্বকাপের জন্য একটা সংজ্ঞা নির্ধারকারি  প্রতিচ্ছবি। এটিকে ইউরোপিয়ানদের ক্রান্তীয় অঞ্চল পূনঃআবিস্কারঃবলা যায়।  তারপর সমুদ্র ধারে সুগারলোফ পর্বতের কিনারে  সৈন্য ঘাটির মধ্যে ইংরেজদের মজা করে বেড়ানো দারূন একটা আবহ । সবশেষে শনিবার গভীর আমাজন জঙ্গলের  ভিতরে ইতালির বিরুদ্ধে গর্জন শোনাগেল।
দুনিয়ার সর্ববৃহৎ প্রদর্শনি বিশ্বকাপ ক্লান্তিহীনভাবে রাশিয়া ও চিনবিরোধী প্রচার চালিয়ে তাদের যে কুৎসা করে বেড়াচ্ছে তা এখন হিস্টেরিয়ার পর্যায়ে চলে গেছে।  আর এর মানেই হচ্ছে ব্রিকসকে লক্ষ্য করা কেননা ব্রাজিল আমাজন জঙ্গলের বিড়াট অংশ জুড়ে প্রগতিশীল লাতিন আমেরিকার সাথে সংহতি জ্ঞাপন করে মনরো মতবাদকে টয়লেট পেপার বানানোর সাহস দেখিয়েছে।

সম্প্রতি ব্রাজিল ৩০ মিলিয়ন মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করেছে। চিন স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ করেছে। মদমত্ত ইয়োলেতসিনের আমলের মত রাশিয়া আর ভয় পেয়ে পীড়ণের শিকার হতে চায় না। গত কয়েক বছর ধরে বিশ্বকাপ মানে ব্রিকসঃ ২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা, এখন ব্রাজিল আর ২০১৮ সালে রাশিয়ায়। ২০২২ সালে কাতারে হলে তা হবে উপসাগরীয় তেলের পয়সায় ঘুষের কারবার।
মজার ব্যাপার লন্ডন রাশিয়ার  টাকাকে ভালবাসে, চিনের বিনিয়োগ কামনা করে আর ব্রাজিলের মৃদু শক্তিকে সহ্য করে। সবকিছু নিয়ে ব্রিটিশ তাদের রসিকতা দিয়ে জঙ্গলের ভিতরে গর্জন যেটা ন্যাটো অনেক লালসা নিয়ে মাঝ জঙ্গলে শুরু করেছে( পানির জন্য যুদ্ধ) তা  সহজে ব্যাখ্যা করতে পারবে ।
 

 

অন্য বিশ্বকাপ  

জি ৭৭+ চিন শীর্ষ সম্মেলন বাস্তবে যেখানে জাতিসংঘের ১৩৩ সদস্য ছিল, বিশ্বকাপ শুরুর দুই দিন পর ব্রাজিলের প্রতিবেশী বলিভিয়া  হোষ্ট করল। সভাপতিত্ব করলেন ইভো মরালেস।  যে প্যাটাক্সোস জার্মানিদের মুগ্ধ করেছে  তাদেরই দূর সম্পর্কের চাচাতো ভাই মরালেস। এই মিটিঙকে আলবা( আমেরিকায় বলিভারিয়ার বিকল্প সংগঠন) ও ব্রিকসের সমন্বয় বলা যায়।  আমেরিকার আপত্তিকারিরা ক্ষেপে গেছে যে ব্রিকস বহু মেরু বিশ্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ফটবল খেলার মধ্যেও তার প্রতিফলন  টের পাওয়া যাচ্ছে। ধরা যাক, একদিকে স্পেন, জার্মানি, ইতালি আর অন্যদিকে ব্রাজিল, আর্জেইন্টিনা ও উরুগুয়ে। শিল্পসমৃদ্ধ উত্তরের প্রভাবের বিরুদ্ধে  দক্ষিণ-দক্ষণের যে আঘাত ফটবলেও তা জারি আছে। ব্রাজিল, চিন রাশিয়া ভিন্ন ভিন্ন কৌশল থেকে দক্ষিণ –দক্ষিণ সংহতিতে দক্ষিণের ব্যাংক যেটি আগামিতে ব্রিকসের উন্নয়ন ব্যাংক হিসাবে গন্য হবে সেখান  থেকে বাজি ধরছে।

জি ৭৭ যে উপনিবেশিকতাবাদের বিরুদ্ধে , কোন সাম্রাজ্যের ভিত্তিতে নয় এবং এন এস এ সমন্বিত নজরদারিসূলভ কোন হস্তক্ষেপের জন্য উন্মুক্ত দক্ষিণ দুনিয়া নয় তা স্মরণ করা খুব বেশি বলে কখন গন্য হবে না।

. এখন আসা যাক ফিফা অনুমোদিত আমোদ প্রমোদের জন্য নির্ধারিত স্পন্সরের দিকে । স্পনসেরসিপের শীর্ষে যেগুলি আছে সেগুলি হল অ্যাডিডাস, কোকা-কোলা, হুয়ান্ডাই, মটরস, সনি, ভিসা, বাডওয়াইজার, ক্যাস্ট্রল, কন্টিন্যান্টাল, জনসন  এন্ড জনসন   যেগুলি এবার বিজ্ঞাপণ যুগের ইতিহাসকে ভেঙ্গে দিয়েছে।

অন্যদিকে দেখা যাচ্ছে দক্ষিন-দক্ষিণের নানা সংগঠন, সংহতি জ্ঞাপন ,সামাজিক আন্দোলন যারা পুঁজিবাদ পরবর্তি নব্য উপনিবেশবাদের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছে,  দাড়িয়েছে  গরিবের প্রতি  অপরাধের বিরুদ্ধে । কঠোরভাবে শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানের সকল কিছুকে অভিযুক্ত করে তাদের  বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।  এবং এটা বিস্ময়কর নয় যে এই আন্দোলের মাঝে দক্ষিণ জগতের নায়ক, ঈশ্বরের  হাত বলে পরিচিত দিয়াগো ম্যারাডনাকে কথা বলতে দেখা যাচ্ছে। তিনি মন্তব্য করেছেন যে ফিফা পাবে ৪ বিলিয়ন ডলার আর বিজয়ী জাতি পাবে ৩৫ মিলিয়ন ডলার।কিন্তু পরিসংখ্যানটা ভুল। বাস্তবে, করপোরেট বানিজ্য ফুটবলের মৃত্যু ঘটাচ্ছে।
.

ফুটবল একটি যুদ্ধ

পুঁজিবাদি বিশ্বায়নকে যেভাবে বিশ্বকাপ ফুটবলের মাধ্যমে চিত্রায়িত করে দেখানো হয়েছে তার সাথে সমান্তরালভাবে  এসেছে সমসাময়িক বিড়াট বানিজ্য ও জাতিয়তাবাদ। তবে জগত কখন সমান ছিল না বা হবেও না।  হিমালয়, পামির বা হিন্দু কুশের মত এর ভিন্ন ভিন্ন উচ্চতা, বরফ ধ্বসের মত ব্যবসা ,বাণিজ্য, অভিবাসীর আগমন ও প্রযুক্তির উঠানামার উপর রাস্ট্রের অবস্থান নির্ভরশীল।  এগুলির কোন কিছুই জাতীয় উপাদানকে নষ্ট করতে পারে না। এটি এখন আমাদের বিরুদ্ধে -তোমরা তোমাদের বিরুদ্ধে আমরা।

ফুটবলের ক্ষেত্রে উত্তর জাতীয়তা বলে কিছু নেই। নিরেট ভূরাজনৈতিক অবস্থান থেকে ভীষণভাবে কেন্দিভুত ইউরোপিয় ইউনিয়ন ভেঙ্গে যাচ্ছে দক্ষিনপন্থি বা উগ্র দক্ষিনপন্থি জাতীয়তাবাদি দলের কাছে । ভূরাজনিতির সাথে ফুটবলের তুলনা করলে দেখা যায় যে এখানে শুধুমাত্র একটা ব্যতিক্রমী শক্তি বিরাজ করছে তা নয় বরং কয়েকটি শক্তি যেমন স্পেন থেকে  ব্রাজিল, জার্মানি থেকে ইতালি, আর্জেন্টিনা থেকে ফ্রান্স।

যে  ডাচ জাতীয় দল ১৯৭৪ সালে বিশ্ববাসীকে চমকে দিয়েছিল (যদিও তারা জয় পায়নি) তার  কোচ রাইনাস মাইকেল একদা বলেছিলেন যে ফুটবল একট যুদ্ধ। ম্যাভারিক ছিনেমার পরিচালক স্যামুয়েল ফুলার  যেমন বলেছিলেন ছিনেমা হল একটা যুদ্ধক্ষেত্র। বিশ্বকাপ জাতীয়তার সংঘর্ষের নিরিখে যুদ্ধ। তাই খেলাটা হল নিজ নিজ গোত্রকে বেছে নেওয়া। নিজের গোত্র হেরে গেলে আর একটা গোত্রে জোগদান করা । কোন বিলুপ্ত এপিকিউরিয়াসের চেলা ইতালিকে এই ভাগে ফেলবে। তৎসত্ত্বেও তাদের একটা আন্দোলিত করার মত জাতীয় সঙ্গীত  আছে। তারা সেরা খাবার খাবে , পড়বে সেরা কাপড় । তবে অবশ্যই তাদের জাদুকরি  ফটবলার আন্ড্রিয়া পার্লো আছে।

খেলার এক নতুন পদ্ধতি

ফুটবলের দেশ হিসাবে বহুল প্রশংশিত হলেও ব্রাজিল কার্বন নিঃসরণ কমাতে বৈশ্বিক নেতৃত্বের ভুমিকা নিয়েছে। এমনটাই জানান দিচ্ছে সদ্য প্রকাশিত বিজ্ঞান সাময়িকীগুলি। একই সময়ে দেশটি বনকে রক্ষা করে কৃষি ফলন বাড়িয়ে তুলেছে।

অন্যান্য অনেক কিছুর সাথে ব্রাজিল এবং এই বিশ্বকাপ পেয়েছে জীবন্ত  মেসি নামক এক রুপককে। ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট দিলমা রুসেফ গতানুগতিক আন্তরিক ব্রাজিলবাসীকে আবেদন জানাতে বাধ্য হয়েছেন যেন তারা সহনশীলতা, বৈচিত্র্য , আলোচনা এমনকি স্থিতাবস্থার পক্ষে অবস্থান নেয়।বর্ণবাদ ও সংস্কারের বিরুদ্ধে তিনি সমালোচনা করেন যেন বিদেশী বিনিয়োগ কোন ভাবে সমস্যার  মধ্যে না পড়ে।

ধরে নেওয়া হচ্ছে যে গড় ব্রাজিলবাসী সাদর সম্ভাষণ জানাবে। কিন্তু যে বিষয়টি বড় ঝামেলা তৈরী করতে পারে সেটি হল নাগরিক স্থানান্তরজনিত যে বড় কাজের জন্য ২ লাখ মানুষকে তাদের বাস্তুভিটা থেকে সরাতে হবে বা সরানোর হুমকি চলছে তা থেকে। বস্তুত দূর্নীতির কারনে এই প্রকল্পের মাত্র ১০ ভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। এর মধ্যে আর একটি উল্লেখযোগ্য তথ্য হচ্ছে যে রিও শহরে শ্রমিক শ্রেনীর জন্য হযবরল পরিবহন ব্যাবস্থায় কোন বিনিয়োগই হয়নি।

জনপ্রিয় লুলা ২০০৯ সালে ঘোষণা দিয়েছিল যে কোন করপ্রদানকারিরর টাকা বিশ্বকাপে ব্যায় হবে না। বাস্তবে সরাসরি জনতার টাকা উক্ত খাতে ব্যায় না হলেও এসেছে অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য জাতীয় ব্যাংক থেকে । স্টডিয়াম নির্মাঙ্কারিরাও কর ছাড় থেকে বহত লাভবান হয়েছে।

মোদ্দাকথা রুসেফ গণ্মাধ্যম যুদ্ধে হেরে গেছে। বার বার ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করেছে যে বিশ্বকাপ থেকে অর্জিত অর্থের কিছু অংশ স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যায়িত হবে। কিন্তু অর্ধেক জনতাও তা বিশ্বাস করেনি। তথাপি এটা সত্য যে ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতলে রুসেফ স্বাভাবিভাবে পূনঃনির্বাচিত হবে।

কিন্তু সাম্প্রতিক আন্দোলনের ঢেউ  বর্তমান প্রশাসনকে নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছে। মনে হচ্ছে যেন এই বৈচিত্রময় সামাজিক আন্দোলনগুলি একটা চূরান্ত কাল্পনিক ইচ্ছা করেছে যে এক ধাক্কায় শত বছরের অন্যায় দূর করে ফেলবে।

তাই বলা যায় যে সমস্ত নাটকটা শুধুমাত্র নব্যউদারবাদ বা পুঁজিবাদবিরোধী আলোড়ণ নয়। এর অবস্থান জাতীয়তার সীমানা ছাড়িয়ে। এটি বিপ্লবের ছুতা হিসাবে ফটবলকে ব্যাবহার করার পাঠ্যপুস্তককে ছাড়িয়ে যাবে । ফুটবলকে ঘিরে যে ফলাফলই আসুক এখন দক্ষিণ জগতকে কিছু শিক্ষা দেবার বাকি আছে ব্রাজিলের।
জয়লাভে অথবা মহিমাময় পরাজয়েও ব্রাজিল এমন এক অবস্থানে উন্নিত হতে পারে যে সে একটা নতুন, অহমহীন, নব উপনিবেশবাদ বিরোধী, অস্ত্রের দামামা ছাড়া  শক্তির মহড়া দিতে পারে ও নেতৃত্ব দিতে পারে। বহু মেরুর দুনিয়ার জন্য সখা নির্বাচন করতে পারে,  ভুরাজনৈতিক ঐক্যের জন্য কোটারি করতে পারে।  নতুন মহিমাময় খেলাটি তবে হোক শুরু।
.

Advertisements

 পুঁজির সহজ পাঠ

                                        

অধ্যায় ১ঃ পণ্য

১। পণ্যের দুটি রুপঃ ব্যাবহারিক মূল্য মূল্য

পুঁজিবাদি উৎপাদন পদ্ধতিতে সম্পদ টিকে থাকে বিশাল পণ্য সম্ভার হিসাবে( immense collection of commodities)। আর প্রত্যেকটি একক পণ্য এর প্রাথমিক রুপ। তাই পণ্য বিশ্লেষণের মধ্য দিয়েই অনুসন্ধান শুরু।

পণ্য কি? ঃ যে দ্রব্য/ জিনিস তার গুনে মানুষের যে কোন চাহিদা পূরণ করে তাই পণ্য।

ব্যাবহারিক মূল্যঃ একটি বস্তুর উপকারিতা বা উপযোগিতাই হল সেই বস্তুর ব্যাবহারিক মূল্য( use value)। কিন্তু এই উপযোগিতা বিষয়টা আকাশে ঝুলে থাকে না। এটি পণ্যের বস্তুগত গুণের উপর নির্ভর করে। যেমন, একটি হাতুরি। তার মাথায় ভারী লোহা ও ধরার জন্য হাতল থাকায় এটি দিয়ে ইট ভাঙ্গা যায়। বা একটা লুঙ্গি যা মানুষের লজ্জা নিবারণ করে। এবং দশটা হাতুড়ির সাহায্যে দশ জন শ্রমিক কাজ করতে পারে মানে একটা হাতুড়ির চেয়ে দশটার ব্যাবহারিক মূল্য বেশি। আর  আমরা যখন ব্যাবহারিক মূল্যের পরীক্ষা করি তখন সুনির্দিষ্ট পরিমাণের কথা ভাবি। যেমন এক ডজন ডিম/ কলা ইত্যাদি। এখানে জেনে রাখা ভাল যে ব্যাবহারিক মুল্য উপভোগ করার জন্য প্রয়োজনীয় শ্রমের আলচনার দরকার পড়ে না। আর একটা কথা মাথায় রাখা উচিত যে আমরা যখন সম্পত্তির কথা বলি তখন অনেক কিছু ভাবতে পারি। যেমন টাকা, সোনা , ঘর বাড়ি, আলু পটল ইত্যাদি। মানে উপকারিতা/ উপযোগিতা আছে এমন কিছুকেই চিন্তায় আনি। অর্থাৎ সম্পত্তি বিষয়টার বস্তুগত ভিত্তি( material content of wealth)  থাকে ব্যাবহারিক মূল্যের উপর।

বিনিময় মূল্যঃ যে পরিমাণ বা অনুপাতের সম্পর্কে এক ধরণের ব্যাবহারিক মূল্য আর এক ধরণের ব্যাবহারিক মূল্যের সাথে বিনিময় করা যায় তাই বিনিময় মূল্য( exchange value)। উদাহরণস্বরূপঃ একজন দিনমজুর বাজারে গিয়ে একটা মুরগী বেঁচে তিন কেজি চাল কিললেন। তার মানে- একটি মুরগীর ব্যাবহারিক মূল্য সমান তিন কেজি চালের ব্যাবহারিক মূল্য । তবে স্থান কালে এই সম্পর্ক পাল্টে যেতে পারে। খেঁয়াল করলেই দেখা যাবে বস্তুর মধ্যে বিনিময় মূল্য ব্যাপারটা একটা অ্যাকসিডেন্টের মত যেন বস্তুর মধ্যে আগে থেকেই ছিল মনে হয় যাকে সহজাত বলে। অর্থাৎ পণ্যের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে সম্পর্কিত। কিন্তু বিষয়টাকে বিরধাত্নক মনে হয়। কারণ কোন কিছুর মূল্য সহজাত হতে পারে না। কিংবা একটা জিনিসের মূল্য ততটুকুই যতটুকু সেটা বহন করে। একটু জটিল হয়ে গেল মনে হয়। যাইহোক, পণ্য উৎপাদনে শ্রম আলোচনা করলে আশা করি বুঝতে সুবিধা হবে। এখন বিনিময় মূল্যের আরো কিছু দিক বুঝার জন্য আরো কিছুটা বাড়তি আলোচনা করি।

ধরা যাক, ১ মণ ধান বেঁচে একটা মাছ ধরার জাল বা ২ মণ গরুর খাবার বা ২ টি শাড়ি কেনা যায় মানে এক মণ ধানের বিনিময় মূল্য একাধিক এবং জালের সাথে গরুর খাবার বা গরুর খাবারের সাথে শাড়ি বিনিময় করা সম্ভব। তার মানে একটি পণ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণ দিয়ে আর একটি পণ্যের নির্দিষ্ট পরিমাণ বিনিময় করা যায়। অর্থাৎ বিনিময় মূল্য ব্যাপারটা সমান কিছু প্রকাশ করছে। এবং এটি প্রকাশের এমন একটি ধরণ যা দিয়ে বস্তুর মূল সত্তাকে আলাদা করে দেখা যায়।

এই যে দুটি বস্তু বিনিময় মূল্যের মাধ্যমে সমান তা আসলে ৩য় আর একটি জিনিসের সমান। যেমন, তিনটি সরল রেখা দিয়ে ত্রিভূজ বানালে যে ক্ষেত্রফল হয় তা কিন্তু সম্পুর্ণ ভিন্ন তৃতীয় আর একটি জিনিসে পর্যবসিত। কিন্তু পণ্যের ক্ষেত্রে এর সাধারণ উপাদানটি কোনভাবেই জযামিতিক বা রাসায়নিক বা প্রাক্রিইতিক কিছু নয় বরং বস্তুর ব্যাবহারিক মূল্যের বিমুর্ত ( abstract) রুপ। এই বিষয়টিও শ্রম আলোচনার সাথে আরো সহজ হওয়ার কথা।

মানব শ্রমঃ বস্তুর মধ্যে ব্যাবহারিক মূল্য বাদ দিলে যা থাকে তা হল শ্রম। মূর্ত বস্তু চেয়ার , টেবিল জাতীয় কোন ব্যাবহারিক মূল্যই বোধগম্য হবে না যদি না মানব শ্রমকে বিবেচনা না করি। তাই দেখা যাচ্ছে যে শ্রমের কারণে বস্তুর  ব্যাবহারিক মূল্যের বাইরে  আর একটা মূল্য আছে। আর এই পণ্যের মূল্য নির্ভর করে তাতে কতটুকু শ্রম নিযুক্ত হল তার উপর। সাধারনত ঘন্টা বা দিনের হিসাবে শ্রমের পরিমাপ করা হয়।

কিন্তু একই পণ্য তৈরীতে দক্ষতা- অদক্ষতার কারনে এক এক জনের এক এক সময় লাগলে ঐ পণ্যের ভিন্ন ভিন্ন মূল্য তৈরী হয় না বরং একটি নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সমাজে একটাই মূল্য তৈরী হয়। আর সেটা ঐ সমাজের প্রয়োজনীয় গড় শ্রম সময়ের(Necessary average labor time)  উপর নির্ভর করে। প্রয়োজনীয় গড় শ্রম সময় ব্যাপারটা সামাজিক স্বীকৃতির ব্যাপার।   যেমন কোন সমাজে ১ বিঘা জমিতে ধান রোপণ করতে ১০ জন ক্ষেতমজুরের গড়ে ১ দিন লাগে । সেখানে যদি ১০ জন মধ্যবিত্ত শিক্ষিত যুবক শখের বশে মনের আনন্দে কবিতা লেখার মত শিল্প সম্মত উপায়ে রোপন করে ১০ দিন লাগায় তাতে সমান সংখ্যক মানুষের বেশি শ্রম সময় লাগার কারনে উক্ত পণ্যের মূল্য বেড়ে যায় না বরং সে অঞ্চলের যে গড় শ্রম সময় ১ দিন তাই মুল্য নির্ধারণ করে।

 প্রয়োজনীয় গড় শ্রম কোন স্থির ধারনা নয়- এটি উঠা নামা করতে পারে উতপাদন ক্ষমতার নিরিখে। যেমন বৈজ্ঞানিক অগ্রগতির ফলে মানুষ যন্ত্রের সাহায্যে কম সময়ে উৎপাদন করতে শিখেছে। ফলে যত বেশি উৎপাদন ক্ষমতা তত কম সময়ে একটি পণ্য তৈরী সম্ভব এবং সেই পণ্যের মূল্য তত কমে যাওয়া। কয়েক টন কয়লা তুলতে যে পরিমাণ শ্রম লাগে তার চেয়ে অনেক বেশি শ্রম সময় লাগে এক টুকরা হিরা উৎপাদনে  এবং সেকারনেই কয়লার মূল্যের চেয়ে হিরার মূল্য অনেক।

আবার ব্যাবহারিক মূল্য থাকলেই যে বিনিময় মূল্য থাকবে তা নয়। যতক্ষণ না শ্রম যুক্ত হয় ততক্ষণ কোন বস্তুর মূল্য থাকে না। তাই, বাতাসের ব্যাবহারিক মূল্য থাকলেও বিনিময় মূল্য বা মূল্য থাকে না।

ইউক্রেন পরিস্থিতি ও বিশ্ব মোড়লদের শঠতার নমুনা

 

 

ইদানিং ইউরোপ আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমের সংশ্রবে আসলে যে কারো মনে হবে দুনিয়াটা বোধ হয় কিছু হিংস্র লোক  গ্রাস করে ফেলল । টিভি খুললেই ভেসে আসে উত্তর পশ্চিমের মহান(!) নেতৃবৃন্দের উদ্বিগ্ন ও পরিস্থিতি মোকাবেলায় বলিষ্ঠ  মুখ।  তাদের মধ্যে আছেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা ও সেক্রেটারি অব স্টেট জন কেরি। তারা প্রায় প্রতিদিন রাশিয়ার প্রতি কিছু শব্দ নিক্ষেপ করে চলেছেন যা ইউরোপ আমেরিকার আকাশে বাতাশে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।

এবার আসি, কে কি বলেছেন। রুশ জনগোষ্ঠী অধুষিত ক্রিমিয়ার মানুষকে আসন্ন বিপদ থেকে উদ্ধার করার জন্য সৈন্য পাঠানোর প্রস্তাব রাশিয়ার পার্লামেন্টে পাশ হলে  বারাক ওবামা  চিৎকার করে বলতে থাকেন এ ঘোর অন্যায়। তিনি রাশিয়াকে আগ্রাসণ, ভীতিপ্রদর্শণ, সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন ও আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের দায়ে অভিযুক্ত করেন এবং রাশিয়া তার পথ থেকে সরে না দাড়ালে  আন্তর্জাতিক গোষ্ঠীর (community) সহায়তায় তাকে উচিত শিক্ষা দেবেন । জন কেরি হুঙ্কার দিয়ে বলেছেন একুশ শতকে এসে উনিশ শতকের আচরণ কেউ করতে পারে না। অতি পরিচিত মুখ হিলারি ক্লিনটন  রাশিয়ার প্রেসিডেণ্ট পুতিনকে নব্য হিটলার বলে অভিহিত করেছেন। ইউরোপের অন্যান্য নেতারা আমেরিকাকেই প্রতিধ্বনি করে চলেছেন।  এরা রাশিয়া এবং ক্রিমিয়ার কর্মকতাদের ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি এবং তাদের সম্পত্তি  অবরুদ্ধ (freeze) করবে বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

উত্তর পশ্চিমের নেতাদের বলা কথার সাথে তাদের আচরন ও কর্মকান্ডকে মিলিয়ে দেখা যাক।  ১৯৫০-৫৩ সাল । তখন যেহেতু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মধ্য দিয়ে দানব ফ্যাসিস্ট শাসক হিটলার- মুসোলিনির পরাজয় ঘটেছিল সে অর্থে তাকে নতুন দুনিয়া তথা সভ্য দুনিয়া বলা যেতে পারে। সেই সভ্য দুনিয়ায় কোরিয়া নতুন স্বাধীনতাপ্রাপ্ত একটি দেশ। উত্তরে তাদের শাসন প্রতিষ্ঠা  করলেও দক্ষিন অংশ থেকে গিয়েছিল জাপানি ঔপনিবেশিক দালালদের হাতে। সেটাইতো উদ্ধার করার নতুন সংগ্রামে অবতীর্ন হয়েছিল কোরিয়া। কিন্তু দালালদের রক্ষায় গণতন্ত্রের বুলি আওড়িয়ে এগিয়ে যায় আমেরিকা । সেই ভয়াবহ যুদ্ধ আজো শেষ হয় নি। দু টুকরো  হয়ে গেছে দেশটি।

পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম যুদ্ধ হিসাবে পরিচিত ভিয়েতনাম যুদ্ধ। স্থায়ীত্বকাল  ১৯৫৬- ১৯৭৫। এখানেও কোরিয়ার মত একই অজুহাতে দক্ষিন ভিয়েতনামের পক্ষ নেয় আমেরিকা। নির্বিচারে মানুষ খুন করে। ভয়াবহ নাপাম বোমা নিক্ষেপ করে যার ফলাফল আজো সেই অঞ্চলের মানুষ তাদের শরীরে মননে বয়ে চলেছে। কিন্তু তাদের গনতন্ত্রের ঠুনকো দাওয়া সেদিন আমেরিকার মানুষকে বেশি দিন গেলাতে পারেনি। সেই যুদ্ধে আমেরিকার শোচনীয় পরিনতি ঘটে।

 

ভিয়েতনামে নাপাম বোমায় দগ্ধ শিশু

 

 

সে সময়ে আরো কিছু উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে। ১৯৫৬ সালে মিশরের প্রেসিডেন্ট গামাল আব্দেল নাসের সুয়েজ খালকে জাতীয়করণ করলে ব্রিটেন ফ্রান্স, ইসরাইল ও আমেরিকা তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে। চিরাচরিত যুক্তি নব্য হিটলারকে উৎখাত করে তাদের পছন্দের গণতন্ত্রীকে গদিতে বসান। সি আই এ’র তত্ত্ববধানে বে অব পিগে ব্রিগেড ২৫০৬  আমেরিকার মিয়ামিতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বাহিনী  ১৯৬১ সালে কিউবার বিপ্লবী সরকারকে উৎখাত করতে আক্রমণ চালায়। সেখানে তাদের প্রতিবিপ্লবী প্রচেষ্টা ব্যর্থ হয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ পাকিস্তানি প্রায় ঔপনিবেশিক শোষণ অত্যাচার থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা নিয়ে লক্ষ লক্ষ জনতার অংশগ্রগণে মরণপণ লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। পাকিস্তানি দানব ও তাদের দেশীয় দোসর আলবদর আলশামস খুন, অগ্নিসংযোগ, লু্‌ট, নারী ধর্ষণে মেতে উঠেছিল। সে  সময় হানাদারদের দাড়ানোর জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরের উদ্দেশ্যে সপ্তম নৌবহর পাঠায়। সেদিন অবশ্য সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় দোসরদের এই সকল ঘৃন্য কার্যকলাপের বিরুদ্ধে দাড়িয়েছিল।

সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর ইউরোপ আমেরিকা আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে। তারা ঘোষণা দেয় পুঁজিবাদের বিকল্প বলে আর কিছু নেই। যেখানেই তাদের আধিপত্য বিস্তারে বাঁধা এসেছে সেখানেই তারা ঝাঁপিয়ে পড়েছে। শুধু সেই অঞ্চলের জনতাকে ধোঁকা দেওয়ার জন্য নানান সময়ে নানান প্রকল্প হাজির করেছে। যেমন মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, মানব অধিকার রক্ষার যুদ্ধ। আর এই সকল ঘৃন্য  পরিকল্পনার সমর্থন আদায় করে চলেছে বিবিসি, সিএন এন, ফক্স নিউজ সহ সকল সাম্রাজ্যবাদী সংবাদ মাধ্যম। এরা রাতারাতি যে কাউকে নায়ক অথবা ভিলেন বানিয়ে ফেলতে পারে। তারই সফল মঞ্চায়ন ঘটে ইরাকে সাদ্দাম হোসেনের কাছে মানব বিধ্বংসী অস্ত্রের সন্ধান দিয়ে। যুগোস্লাভিয়ার স্লোভদান মিলোসেভিচকে নব্য হিটলার উপাধিতে ভূষিত করে নতুন দিনের পণ নিয়ে কসোভো, বসনিয়া হার্জেগোভিনার জনপদকে হাজার হাজার বোমার আঘাতে গুড়িয়ে দেওয়া হয়। আফগানিস্তানে যে তালেবানদের এক সময় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অর্থকড়ি দিয়ে পুষেছিল , প্রয়োজন ফুঁরিয়ে যাওয়ায় তাদেরকে উচ্ছেদের জন্য আক্রমণ করতে দ্বিধা বোধ করেনি। কয়েক বছর আগে লিবিয়ার গাদ্দাফিকে স্বৈরশাসক, দানব , নব্য হিটলার বলে অভিহিত করে । সেখানে গণতন্ত্রের ফসল ফলানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে আক্রমণ করে ইউরোপ আমেরিকা। ফলাফল লিবিয়া এখন ছিন্নভিন্ন। রাষ্ট্র বলে একে চেনার আর কোন উপায় নেই। নানান দল উপদলে বিভক্ত এই ভূখন্ড । সিরিয়াতে আসাদ সরকারকে হটানোর জন্য সি আই এ একদল সশস্ত্র দানবকে সাহায্য করে যাচ্ছে । কোন কিছুতে তাদের বাছবিচারের দরকার পড়ে না। তাদের অর্ধ শতাব্দীর ইতিহাস নিশ্চিতভাবে চরম প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির সংগ দানের ইতিহাস।  

এদের কর্মকান্ডের ফিরিস্তি অনেক লম্বা। তাহলে আজ যে তারা রাশিয়াকে আগ্রাসণ, ভীতি প্রদর্শণ, সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘনের দায়ে  অভিযুক্ত করছে যদিও রাশিয়া এই মুহুর্তে সদৃশ কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত নয়  তাদের কর্মকান্ড কি উপরোক্ত সকল দায়ে অভিযুক্ত নয়?  জন কেরি যখন অন্যকে একুশ শতকের নৈতিকতার সবক দেয় তখন কি তিনি তাদের কয়েক দিন আগের আগ্রাসণের কথা ভুলে ছিলেন কিংবা এখনও পৃথিবীর নানা প্রান্তে যে তারা উনিশ শতকের কাজগুলিই করে যাচ্ছেন তা ভুলে বসেছেন?

আবার, ক্যামেরুন রাশিয়াকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন যে ক্রিমিয়ার গণভোটকে কাজে লাগিয়ে কৃষ্ণ সাগরের উপর প্রভূত্ব করতে চাইলে তারা কঠোর ব্যাবস্থা নেবেন।  সত্যিই সেলুকাস! কয়েকদিন আগেই সিরিয়ায় সৈন্য পাঠানোর জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ভোটাভোটি হয়েছিল। ভাগ্যিস ক্যামেরুনের প্রস্তাব সেদিন পাস হয়নি! পাস হলে আজ একই কাজ করার জন্য রাশিয়াকে দোষারোপ করার কিছু থাকত না।

এবার, ইউক্রেনে তাদের ষড়যন্ত্রের কর্মকান্ড বিচার করা যাক। প্রথম দফায় ধরা পড়া ফোনালাপে ভিক্টরিয়া নুল্যান্ড ইউক্রেনে তাদের পছন্দের প্রতিনিধির কথা ইউক্রেনে আমেরিকার রাস্ট্রদূতকে জানান যা এখন আন্তর্জালের কারনে অনেকের গোচরে এসেছে। ইয়ানোকোভিচের সরকারের বিরুদ্ধে গড়ে উঠা আন্দোলনকে শুরু থেকে ইউরোপীয় ও আমেরিকার নেতারা পৃষ্ঠপোষকতা দিয়ে এসেছে। আমেরিকার প্রভাবশালী সিনেটর জন ম্যাককেইন সরাসরি আন্দোলনকারীদের সাথে মঞ্চে উঠে বক্তৃতা করেছেন, র‍্যালিতে যোগ দিয়েছেন। ইউরোপীয় পার্লামেন্টের কতিপয়  সদস্যকেও একই কাজ করতে দেখা যায়। তাদের ভয়ংকর ষড়যন্ত্রকে বোঝার জন্য  দ্বিতীয় দফায় ধরা পড়েছে এমন একটি ফোনালাপের সাহায্য নেওয়া যেতে পারে। ফোনালাপ হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্র বিষয়ক প্রধান ক্যাথারিন এসটন ও এস্তোনিয়ার পররাষ্ট্র মন্ত্রি উরমাস পায়েতের মধ্যে। সেখানে পায়েত বলেন কিয়েভে  আন্দোলনকারী ও পুলিশের উপর যে গুলি চলে তা একই বন্দুকধারীদের গুলিতে  নিহত। তিনি আরো বলেন যে আমি এখন উদ্বিগ্ন যে  অলগা বলতে পারে যে এগুলি একই হাতের লেখা একই গুলি। তিনি বলেন এখন এটা আরো স্পষ্ট হচ্ছে যে গুলি চালানোর পিছনে ইয়ানোকোভিচ ছিলেন না ছিল বর্তমান সরকারের কেউ। আর নতুন সরকারে কারা আছে? আমেরিকা ও ইউরোপপন্থী দল ও ব্যক্তি। তার মধ্যে ৭ জন মন্ত্রি নাৎসি সমর্থক। উল্লেখ্য যে অলগা ছিলেন কিয়েভ শহরের মাইদানে ভ্রাম্যমান ক্লিনিকের দায়িত্বরত ডাক্তার।

উক্ত ঘটনা কিসের ইঙ্গিত দেয়? আন্দোলনকারীদের উপর গুলি চালিয়ে আন্দোলনকে আরো বেগবান করা যাতে নির্বাচিত ইয়ানোকোভিচ সরকারকে যেকোন মূল্যে হটানো যায় চাহে সেটা ক্যু দে তা হোক। ইয়ানোকোভিচ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনকে  ইউরোপ আমেরিকা অর্থ সাহায্য থেকে শুরু করে সকল ধরনের সাহায্যই করেছে ইউক্রেনের উপর তাদের অর্থনৈতিক আগ্রাসণ চালানোর জন্য এবং রাশিয়াকে দুর্বল করার জন্য। সুতরাং, এটি স্পষ্ট যে ইউক্রেনের বর্তমান  অবস্থার অবনতির জন্য প্রধানত ইউরোপ ও আমেরিকা দায়ি।  

কিন্তু ইউরোপ আমেরিকার সংবাদ মাধ্যমে এই ঘটনাগুলি পাশ কাটিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিয়েভে মাইদানপন্থীদের আন্দোলন চলাকালীন ইয়ানোকোভিচ সরকারকে স্বৈরশাসক নিপিড়ক বলে অভিহিত করে । সরকারের আন্দোলন প্রতিহত করাকে মানবাধিকার লঙ্ঘন বলে অভিহিত করে। কিন্তু নাৎসি সমর্থকদের উত্থান ও তাদের সশস্ত্র তান্ডবকে চেপে রাখে এই সমস্ত সংবাদ মাধ্যম। আবার, রাশিয়ার পার্লামেন্টে রাশিয়ান জাতীকে উদ্ধারের জন্য ক্রিমিয়ায় সৈন্য পাঠানোর সিদ্ধান্তের পরে শুধু রাশিয়াকেই দানব হিসাবে তুলে ধরেছে তা নয় ইউক্রেনেরর পূর্ব  ও দক্ষিন অঞ্চলে কিয়েভ সরকারকে প্রত্যাখ্যান করে বিশাল আন্দোলনের ঢেউ নেমেছে তাকে রাশিয়ার লেজুড়ে পর্যবসিত করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়া সৈন্য না পাঠালেও ইউক্রেনের সেনাদের ছবিকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে রাশিয়ার সেনা হিসাবে। রাশিয়ায় যে সৈন্য মহড়া চলছে সেগুলির ছবি প্রকাশ করে চালিয়ে দিচ্ছে যে এগুলি ইউক্রেনে ঘটছে। রাশিয়া ও ইউক্রেনের চুক্তি মোতাবেক কৃষ্ণ সাগরে রাশিয়া ২৫০০০ সেনা মোতায়েন রাখতে পারলেও বর্তমানে ১৬০০০ নিয়োজিত রয়েছে সেটাই চালিয়ে দিচ্ছে ইউক্রেনে ১৬০০০ সেনা নিয়োজিত বলে। ঠিক একই জাতের এবং আরো ভয়ানক তথ্য সন্ত্রাস ঘটেছিল স্তালিনের সময়ে ইউক্রেনে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষের ভুয়া খবর প্রকাশ করে। ১৯২১ সালের দূর্ভিক্ষের ছবিকে ১৯৩৪ সালের বলে চালিয়ে আমেরিকার প্রথম সারির নাজি সমর্থক হার্স্ট প্রেস ইউক্রেনে দূর্ভিক্ষের খবর ছাপাতে থাকে। যদিও লুইস ফিচার নামে আরেক আমেরিকার লেখক এর অসাড়তা প্রমাণ করে তথাপি হার্স্ট প্রেস তাদের মিথ্যা তথ্য প্রবাহ চালিয়ে যায়। ইউরোপ আমেরিকার তথ্য সন্ত্রাস সোভিয়েত ইউনিয়নকে রাক্ষস-ক্ষোক্কসের দেশ এবং স্তালিনকে হৃদয়হীন একনায়কে পরিনত করে । কিন্তু আজকের যুগে এসে আগের মত নিরঙ্কুশ দায়মুক্তির সুযোগ নেই।

আজকে ইউক্রেনে যা ঘটছে ঠিক একই রকম ঘটনা ঘটেছিল ২০১১ সালে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট হুগো সাভেচকে ক্ষমতাচ্যুত করার জন্য। ক্যুপুর্ব আমেরিকা ইউরোপের নেতাদের নড়াচড়া দেখলেই বুঝা যায় তাদের মতিগতির খবর। তৎকালীন একজন মিডিয়া সম্রাট প্যাট রবার্টসন  প্রকাশ্যে  বলেন যে আমাদের যে ক্ষমতা আছে তার ব্যাবহার করে এই স্বৈরশাসককে হটিয়ে দিতে পারি । এর জন্য আমাদের আরো ২০০ বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধ করার দরকার নেই । কিন্তু সাভেচের বিরুদ্ধে সংঘটিত ক্যু এক দিনের বেশি স্থায়ীত্ব পায়নি।  ১৯৭৩ সালে  চিলিতে বিপুল ভোটে নির্বাচিত সমাজতন্ত্রী  সালভেদর  আলেন্দেকে রক্তাক্ত ক্যু করে শুধু ক্ষমতাচ্যুত করে না  তাকে হত্যা পর্যন্ত  করে। এটা সকলের জানা যে এর পিছনে আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদ ছিল। সে সময় কুখ্যাত হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিল চিলির জনতার ভুলকে আমরা সমর্থন দিতে পারি না। পানামা, নিকারাগুয়া, হাইতি কোথায় তারা তাদের তথাকথিত মানবাধিকারের বানী উচ্চারণ করে নি? আবার ইসরাইল, সৌদি আরব ,বাহরাইনের মত দেশের সকল কর্মকান্ডকে বৈধতা দেওয়ার জন্য তারা এক পায়ে খাড়া। এইতো তাদের গণতন্ত্র, সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধার নমূনা!  

কিন্তু তারপরেও তারা পার পেয়ে যাচ্ছে শুধুমাত্র সচেতন সংগ্রামী সুনির্দিষ্ট পথের দিশারীদের শক্তিমত্তার দূর্বলতার সুযোগ নিয়ে। আবার এও সত্য যে গভীর অন্ধকার পেরিয়েই দিনের আলো স্পষ্ট হয়।  

 

পুঁজিবাদী সাম্রাজ্যবাদী বাটোয়ারার নির্মম বলি ইউক্রেন


 

২০১৩ সালের নভেম্বরের শেষের দিকে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ইয়ানোকোভিচের সাথে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রত্যাশিত চুক্তি স্বাক্ষর  ভেস্তে যায়। ইইউ যে পরিমান ঋণ দিতে চায় তার চেয়ে অনেক গুন শর্ত আরোপ করায় ইয়ানকোভিচ আরো  সময় নিতে চায় এবং সাম্প্রতিক আর্থিক সঙ্কট মোকাবেলায় রাশিয়ার ১৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ, গ্যাসের মূল্য এক- তৃতীয়াংশ কমিয়ে দেওয়া সহ অনুকূল বানিজ্য সম্পর্কের প্রস্তাব গ্রহণে রাজি হয়। এই সিদ্ধান্ত ইইউ, আমেরিকা এবং ইউক্রেনে ইউরোপের স্বার্থ সংরক্ষনে অঙ্গীকারবদ্ধ দল গোষ্ঠীকে ক্ষেপিয়ে দেয়। শাসকগোষ্ঠীর মধ্যে রাশিয়াপন্থী বনাম ইউরোপন্থী বিভাজন মুর্ত হয়ে উঠে। এটাই বর্তমান ঘটনার সূত্রপাত, সঙ্কটের শুরু।

তথাকথিত বিরোধী দলসমূহ কিয়েভ শহরের রাস্তায় নেমে পড়ে। সরকারকে ইইউ ভুক্ত হওয়ার দাবি জানায় যদিও প্রস্তাবিত ঋণশর্তে ইইউভুক্ত হওয়া বা নাগরিকদের অবাধে ইউরোপ ভ্রমন নিয়ে কিছু ছিল না। ইউরোপে গিয়ে  কাজ করে সুদিন ফিরিয়ে আনবে এই ভ্রান্ত আশায় কিয়েভ শহরের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ  আন্দোলনে শামিল হয়। প্রতিবাদ সমাবেশ – আন্দোলন প্রথম দিকে শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে তা উগ্রপন্থীদের সক্রিয়তায় সহিংস হয়ে উঠে। মূলতঃ পাঁচটি দল এই আন্দোলনের এবং ধ্বংসযজ্ঞের যৌথ সেনাপতি। দলগুলি হলঃ আরসেনিক ইয়াতসেনিউকের নেতৃত্বাধীন ফাদারল্যান্ড পার্টি, ভিটালি ক্লিৎস্কো নেতৃত্বাধীন উডার পার্টি, ওলেগ তিয়াগনিবক নেতৃত্বাধীন ফ্রিডম পার্টি ( সভবদা পার্টি) ,ইউরি লুতসেঙ্কো নেতৃত্বাধীন তৃতীয় গনপ্রজাতান্ত্রিক সংগঠন ও মিকোলা কাতেরিনচাক  নেতৃত্বাধীন ইউক্রেনের ইউরোপিয়ান পার্টি। উক্ত দলসমূহের প্রত্যেকটিই ইউরোপ-আমেরিকার তল্পিবাহক হিসাবে পরিচিত। আমেরিকার কূটনৈতিক ভিক্টোরিয়া ল্যুন্যান্ড ও ইউক্রেনে নিযুক্ত আমেরিকার রাস্ট্রদূতের বহুল প্রচারিত ফোনালাপ বলে দেয় ইউক্রেনের নেতারা কে কার স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। এখন স্পষ্ট যে আরসেনিক ইয়াতসেনিউক আমেরিকার প্রতিনিধি , ভিটালি ক্লিৎস্কো জার্মানির প্রতিনিধি আর সভবদা পার্টি হিটলারের নাজি সমর্থক।  উল্লেখ্য যে, উক্ত দলসমূহের প্রত্যেকটির প্রভাবাধীন অঞ্চল হচ্ছে ইউক্রেনের কেন্দ্র ও পশ্চিমাঞ্চল।  অপরদিকে, অসাংবিধানিক উপায়ে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেণ্ট ইয়ানোকোভিচের আঞ্চলিক পার্টি রাশিয়াপন্থী বলে পরিচিত এবং ইউক্রেনের পূর্ব ও দক্ষিন পূর্ব শিল্পাঞ্চলে এর বিরাট প্রভাব।

ইউরোপপন্থী দলসমূহের আন্দোলনের তীব্রতার প্রতিক্রিয়ায় সরকারপক্ষ বিষয়টিকে  পার্লামেন্টে ভোটের মাধ্যমে সমাধান করতে চায়। ভোটের ফলাফলে বিরোধীরা হেরে যায়। কিন্তু তারা তাদের দাবি থেকে সরে না গিয়ে ইয়ানোকোভিচের ইম্পিচমেন্ট, পদত্যাগ দাবী করে অন্তর্বতিকালীন নির্বাচন দাবী করে। বিরোধীরা আন্দোলনের জোট গঠন করে যা মাইদান বা ইউরোমাইদান বা ইউক্রেনের স্বাধীনতা স্কয়ার  হিসাবে পরিচিতি পায়। তাদের এই তথাকথিত দাবিনামার সাথে একাত্ত্বতা ঘোষণা করে  আন্দোলনকারীদের সাথে মিছিলে যোগ দেন আমেরিকার সিনেটর ম্যাককেইন থেকে শুরু করে ইউরোপের প্রভাবশালী পার্লামেন্ট সদস্য । পোল্যান্ডের  এক এমপি এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে মাইদানে তাবু টাঙ্গিয়ে আন্দোলনকারীদের সাথে যোগ দেয়। একটি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শনের এ এক নজিরবিহীন ঘটনা!

ইয়ানোকোভিচের সরকার প্রথমে আন্দোলনকে দমনের দিকে গেলেও পরে পিছু হটে, আলোচনার পথ বেছে নেয়। কিন্তু পিছু হটে না আন্দোলনকারীরা। তারা তাদের তান্ডব চালাতে থাকে, সরকারকে কোনঠাঁসা করতে থাকে । ফলশ্রতিতে, ২১ ফেব্রুয়ারী, ২০১৪ সরকার ও বিরোধীদল তথাকথিত আন্তর্জাতিক মহলের মধ্যস্থতায় ২০০৪ সালের সংবিধানে  ফিরে যাওয়া, অন্তর্বতিকালীন নির্বাচন ঘোষণা এবং জেলবন্দি সাবেক দূর্নিতগ্রস্ত  প্রধানমন্ত্রী ইউলিয়া টেমসেঙ্কো , ২০০৪ সালের  অরেঞ্জ রেভলিউশনের বিজয়িনীকে মুক্ত করার শর্ত আরোপিত হয় । কিন্তু এই সমঝোতা নাটকীয়ভাবে পরের দিনেই পরিসমাপ্তির মুখ দেখে। ইয়ানোকোভিচকে ক্ষমতাচ্যুত করে নতুন পার্লামেন্ট ঘোষিত হয়,  জার্মান তথা ইউরোপের প্রতিনিধিকে রেসের দৌড়ে পরাস্ত করে  আমেরিকার প্রতিনিধি আরসেনিক ইয়াতসেনিউক  ঘোষিত হয় নতুন প্রধান মন্ত্রী । রাশিয়ান সহ সকল আঞ্চলিক ভাষাকে দাপ্তরিক ভাষার মর্যাদা থেকে বঞ্চিত করার আইন পাশ হয়। আইনশৃংখলা বাহিনী বারকুটকে শুধু বাহিনী হিসাবে বাতিলই করে না  খোলা ময়দানে জনগণের সামনে হাটু গেরে ক্ষমা চাইতে বাধ্য করে তাদেরকে  অপদস্ত করে। সর্বোপরি, কিয়েভ শহরে লাগাতার সহিংসতা, সরকারী অফিস আদালত পুঁড়িয়ে দেওয়া,লেনিনের মুর্তি ভেঙ্গে ফেলা , মানুষ হত্যা  ইত্যাদি পুর্বাঞ্চলের মানুষকে আতঙ্কিত করেছে। তারা তাদের জাতিগত অস্তিত্ব বিপন্ন হতে দেখেছে। এখানেই নাটকের পরবর্তি অংশের শুরু।

৫৮ শতাংশের বেশি রাশিয়ান জাতি অধ্যুষিত স্বায়ত্ত্বশাসিত ক্রিমিয়া স্বঘোষিত কিয়েভ সরকারকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করে। তাদের আদেশ নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানায় এবং হাজার হাজার জনতা রাশিয়ান পতাকা হাতে কিয়েভ সরকারকে ধিক্কার জানায়। তাদের পথ  অনুসরণ করে পুরা দক্ষিন পুর্ব অঞ্চলে হাজার হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে কিয়েভ সমর্থকদের সরকারী অফিস আদালত থেকে বিতাড়িত করার চেষ্টা করে। এবং তারা কিয়েভ সরকারের রোষানল থেকে  বাঁচার জন্য রাশিয়ার কাছে সামরিক সহযোগীতা চান। এর প্রতিক্রিয়ায় রাশিয়ার পার্লামেন্ট রাশিয়ান জাতিকে রক্ষার প্রয়োজনে ক্রিমিয়ায় সৈন্য পাঠানোর প্রস্তাব পাশ করেন। কিয়েভ সরকার রাশিয়াকে ঠেকাতে চেচেন ইসলামি জঙ্গী যাকে রাশিয়ান তালেবান বলা হয় যে অসংখ্য বোমা হামলা, মানুষ হত্যার  সাথে জড়িত সেই উমারভের সহযোগীতা চেয়েছে।  অন্যদিকে রাশিয়ার এই সিদ্ধান্তে ইউরোপ আমেরিকা স্বাধীনতা  সার্বভৌমত্বের বুলি আওড়িয়ে রাশিয়াকে একঘরে করার হুমকি দিয়ে চলেছে।

এতক্ষনের আলোচনায় যা উঠে এসেছে তা আসলে ইউক্রেনে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনা এবং তার প্রতিক্রিয়ার বিবরণ । এবার যাওয়া  যাক ঘটনার আন্তঃসম্পর্কের দিকে।

কে এই ইয়ানোকোভিচ? কি তার আসল পরিচয়? সোভিয়েত ইউনিয়নে বেড়ে উঠা, শিক্ষা লাভ এবং ট্রান্সপর্ট কোম্পানিতে ম্যানেজারের চাকরি লাভ যার ছোটবেলা কেটেছে ক্ষুধা ,দারিদ্র্যে যাকে নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করে টিকে থাকতে হয়েছে ( টেলিগ্রাফ ১২ জানুয়ারী,২০১০) অথচ কিসের বলে আজ তিনি কয়েক বিলিয়ন ডলারের মালিক? এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কেমন করে  ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরে সামাজিক সম্পত্তি ব্যক্তি মালিকানাধীন হওয়ায় একদল লুন্ঠনকারীর হাতে বিশাল সম্পত্তি চলে যায়। ইউক্রেন ইউরোপের সবচেয়ে গরীব দেশে পরিনত  হয়। তিনি তারই একজন এবং তিনি তার দল পার্টি  অব রিজিওনের মাধ্যমে সেই অংশের মানুষকেই প্রতিনিধিত্ব করেন। অন্যদিকে, যে বিরোধী দলসুমূহকে দেখা যাচ্ছে তারাও লুটপাটকারীর অপর অংশকে প্রতিনিধিত্ব করে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে গাঁট বেঁধে দেশের মানুষকে শুষে নিতে চায়। তাদের মধ্য থেকে সর্বাধিক আশির্বাদপুষ্ট নেতা আরসেনিক ইয়াতসেনিউক ইউক্রেন ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রধান ছিলেন। তিনি যে আই এম এফের কাছে ঋণ নিয়ে জনতার উপর কৃচ্ছতা সাধনের নীতির পক্ষের লোক তা তার কথায় প্রমাণিত হয়েছে। তিনি বলেছেন আমরা আই এম এফের শর্ত পূরণ করব।  তিনি তার সরকারে যাদের   নিয়োগ  দিয়েছেন তার সামান্য ফিরিস্তি দিলে স্পষ্ট হয়ে যাবে তিনি কাদের স্বার্থ রক্ষাকারী। আইগর কলমস্কি, ইউক্রেনের তৃতীয় ধনী ব্যাক্তি যিনি ২.৪ বিলিয়ন ডলারের মালিক নিয়োগ পেয়েছেন দেনপ্রপেত্রেভস্কের গভর্নর হিসাবে এবং শীর্ষ দশের মধ্যে অবস্থানকারী সেরগেই তারুতা নিয়োগ পেয়েছে দানিইউস্কের গভর্নর হিসাবে।

সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পরে যারাই ক্ষমতায় গেছে তারা মুষ্টিমেয় পুঁজিপতির স্বার্থই রক্ষা করে এসেছে। ইউক্রেনে ১৯৯১ সালের দিকে ৫১.১ মিলিয়ন জনসংখ্যা ছিল । স্বাস্থ্য খাতকে বেসরকারীকরণ করায় এই খাত গরীব জনতার নাগালের বাইরে চলে যায়।  জন্মহার কমে যায় বেড়ে যায়  মৃত্যু হার- জনসংখ্যা এসে দাঁড়ায় ৪৫ মিলিয়নে। দেশের কলকারখানা থেকে আবাদি জমি দেশি বিদেশী মালিকের দখলে চলে যায়।ল্যান্ডকম নামে ব্রিটিশ একটি গ্রুপ কিনে নেয় ১ লক্ষ হেক্টর সুফলা জমি, রাশিয়ান হেজ ফান্ড  কিনে নেয় ৩ লাখ হেক্টর জমি । গোটা দেশ যেন লুটপাটের এক অভয়ারণ্যে পরিনত হয়েছে। আর এর সকল বোঝা বয়ে ইউক্রেন আজ ইউরোপের সবচেয়ে গরীব দেশ। দারিদ্র্য সীমার নিচে বসবাসকারী জনসংখ্যা সরকারী হিসাবে ২৫%, বেসরকারী হিসাবে ৮০%।  জনগণ এই অবস্থার উত্তরণ চায় কিন্তু তারা নানান আশা ও আশঙ্কার গোলকধাঁধায় আচ্ছন্ন। শাসকগোষ্ঠীর কেউ তাদের ইউরোপীয় জীবনমানের স্বপ্ন দেখালে তাদের দিকে ঝুকে পড়ে আবার ইউরোপপন্থীদের প্রবল অ্যান্টি রাশিয়ান মনোভাব পূর্বাঞ্চলের মানুষকে আতঙ্কগ্রস্ত করে তুলে রাশিয়াপন্থী দলের কাছাকাছি নিয়ে যায়। সুতরাং,  এদের কেউ ক্ষমতায় থাকলে জনগণের মৌলিক সমস্যার কোন পরিবর্তন হবে না। চাই জনগণের নিজস্ব শক্তি যারা পুঁজিবাদী শোষণমূলক ব্যাবস্থার উৎপাটন ঘটিয়ে শোষণহীন সমাজ নির্মান করবে।

যে পশ্চিমা বিশ্ব মুখে সর্বদাই শান্তিপুর্ন আন্দোলনের কথা বলে আসে, যাদের কাছে পার্লামেন্ট হচ্ছে  সমঝোতার পবিত্র জায়গা তারা যাদের সমর্থন জোগাল তারা আগাগোড়াই অগ্নিসংযোগকারী , অস্ত্রবাজ, ভয়ঙ্কর নাৎসি ফ্যাসিস্ট। প্রথম দিকে কয়েকজন আন্দোলনকারী আহত ও নিহত  হলেও পরবর্তিতে সাধারন মানুষ, আইন শৃংখলায় নিয়োজিতদের অনেকেই আন্দোলনকারীদের আক্রমণে আহত ও নিহত হয়। তারা পুরা কিয়েভ শহরকে  ভূতুড়ে বানিয়ে ফেলে।  লেনিনের অসংখ্য মুর্তিকে ভেঙ্গে ফেলে সেখানে ইউক্রেন এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে নাৎসি সহযোগীদের পতাকা উত্তোলন করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে কমিউনিস্ট, পোলিশ, ইহুদি নিধনে নাৎসিদের সহযোগী স্তেপান বান্দেরার সমর্থনে ১৫০০০ মানুষের মিছিল হয় । ওলেগ তিয়াগনিবক নেতৃত্বাধীন ফ্রিডম পার্টি (সভবদা পার্টি ) কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক খুণ ঘোষণা করে। ক্ষমতায় বসে রাশিয়াকে মোকাবেলা করতে তারা ইসলামি জঙ্গিকে নিয়োজিত করতে দ্বিধা বোধ করে না। আর এদেরই হিংস্র ইচ্ছাকে  বাস্তবায়নের জন্য ইউরোপ আমেরিকা জনগণের ইচ্ছার প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর কথা বলে। ভন্ডামির নমূনা বটে!

কিয়েভে নিয়ন্ত্রণ আরোপকারী সরকার আই এম এফ এর কাছে ১৫ বিলিয়ন ডলারের আশ্বাস পেয়েছে যদিও এ বছরটা পার করতে তাদের ৩৫ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন। কিন্তু আই এম এফের শর্ত কি? তাদের ঋণের টাকা সরকার যাতে যথাসময়ে সুদসহ ফেরত দিতে পারে সেজন্য জনগণকে একটু কষ্ট করতে হবে। সরকারী সেবা কমে যাবে, জ্বালানীর দাম একটু বেড়ে যাবে, বেকার সমস্যা আর একট বাড়বে, বেসরকারীকরণে আর একটু গতি আসবে ইত্যাদি ইত্যাদি ।  তাতে কি খেলোয়াড়েরাতো তাদের ইউরোপের জীবনমান এনে দিতেই চেয়েছেন। গ্রীস স্পেন যে ইউরোপের মধ্যে তাতো ভূগোল অথবা গুগল ঘাঁটলেই টের পাওয়া যায়।  খেলোয়াড়েরা তা জানে শুধু জানতে পারল না ভুক্তভোগী জনতা।

 

 

 

 

 

 

ক্রুশ্চেভ ও সোভিয়েত ইতিহাস- মনি গুহ

ভিক্টর হুগো নেপলিয়নের জীবনি নিয়ে যে বইটি লিখেছিলেন তার পর্যালোচনা করতে গিয়ে মার্ক্স তার অষ্টাদশ ব্রুমেয়ার নামক লেখার ভুমিকায় লিখেছিলেন- বিনা মেঘে যেমন বজ্রপাত তেমনি তার লেখায় ঘটনা/ফলাফল (event) স্বয়ং সৃষ্ট। তিনি এর মধ্যে শুধুই একজন ব্যক্তির একক হিংস্র কর্মকান্ড দেখেছেন। অন্যের সাহায্য ছাড়াই এককভাবে  ক্ষমতা চর্চা করতে পারে  বিশ্ব ইতিহাসে যা অপ্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে থাকবে এমনটা তার উপর আরোপ করতে গিয়ে তিনি খেঁইয়ালই করলেন না যে তাকে ছোট করতে গিয়ে বরং মহান ব্যক্তি করে ফেলেছেন।

সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির বিংশতি কংগ্রেসের রিপোর্টে ক্রুশ্চেভ-মিকোয়ান গোষ্ঠী যে বক্তব্য রেখেছিল সেক্ষেত্রেও মার্ক্সের উক্তিটি  সমভাবে প্রযোয্য। ক্রুশ্চেভ-মিকোয়ান গোষ্ঠীর রিপোর্ট থেকে আমরা জানতে পারলাম ১৯৩৪ সালের পর থেকে স্তালিন ধিরে ধিরে নিজেকে পার্টি এবং জনসাধারণের উর্ধ্বে নিজেকে স্থাপিত করেছেন। সাংগঠনিক ক্ষেত্রে লেনিনীয় সংগঠন নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে বুর্জোয়া সামরিক স্বৈরতন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছেন। এই অবস্থা একদিকে পার্টি অভ্যন্তরে গণতন্ত্রকে নস্যাত করেছে, যৌথ নেতৃত্বকে  ক্ষতিগ্রস্ত করেছে, স্বাধীন ব্যক্তিচিন্তা ও পার্টি সভ্যদের কাজকে পঙ্গু করে দিয়েছে এবং স্তালিন সবকিছু করবে এই জাতের ব্যক্তি পুঁজাবাদ  জনতার মধ্যে গড়ে উঠেছে ফলে মহান মানবের উপর নির্ভরশীলতা বেড়েছে। অন্যদিকে, স্তালিন জনতা, পলিটব্যুরো এবং কেন্দ্রিয় কমিটির সাথে দূরত্ব তৈরি করে ব্যক্তিকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছেন। মোটকথা, জাতীয় অথবা আন্তর্জাতিক অঙ্গন যেখানেই যা কিছু ঘটে থাকুক না কেন সবকিছু স্তালিনই করেছেন এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বিগত বিশ বছরের ইতিহাসে সকল সফলতা ও ব্যর্থতার জন্য কেবল স্তালিনই দায়ী। স্তালিনই বিশ বছরের সোভিয়েত ইতিহাসের কারিগর। সোভিয়েত জনতা ছিল কেবলমাত্র  ইতিহাসের পশু খাদ্য আর সিপিএস ইউ ছিল আতঙ্কিত  মৌন ছায়া ।

ভিক্টর হুগো ঐতিহাসিক বস্তুবাদি ছিলেন না। তাই ,ঐতিহাসিক ব্যক্তিত্বকে পর্যালোচনার ক্ষেত্রে তার বিশ্লেষণ ব্যক্তিকেন্দ্রিক ছিল। কিন্তু ক্রুশ্চেভ মিকোয়ান গোষ্ঠী কমিউনিস্ট ফলে তারা ঐতিহাসিক বস্তুবাদি এমনটা আশা করাই যায়। যাইহোক, স্তালিনের ভুমিকা মূল্যায়ন করতে গিয়ে তারা বুর্জোয়া আদর্শের চর্চাকারিদের সমকক্ষ হয়েছেন ফলে তাদের বিচারধারা হয়েছে ব্যক্তিকেন্দ্রিক। সংক্ষেপে সিপিএসিউ এর বিংশতি কংগ্রেস স্তালিন মূল্যায়নে মার্ক্সবাদি বিচারধারাকে পরিত্যাগ করেছে।

সিপিএসিউ এর স্তালিন মূল্যায়ন মার্ক্সবাদের দুটি মৌলিক প্রশ্নের সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সাংগঠনিক ক্ষেত্রে   স্তালিন লেনিনীয় সংগঠন নীতি থেকে বিচ্যুত হয়ে বুর্জোয়া সামরিক স্বৈরতন্ত্রের এবং  চিন্তায় ও  কাজে ব্যক্তিচিন্তার আশ্রয় নিয়েছেন- এটা  বিগত বিশ বছরের একটা দিক।

বিগত বিশ বছরের অন্য দিকটা কি? বিগত বিশ বছরে  বিড়াট সাফল্য এসেছে জীবন দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলেছে।  সোভিয়েত ইউনিয়ন শিল্পোন্নত দেশসমূহের মধ্যে দ্বিতীয় এবং ইউরোপের মধ্যে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।  শিক্ষা,স্বাস্থ, বিজ্ঞান, কলা কৃষ্টি সকল ক্ষেত্রে বিকাষ ও অগ্রগতি ঘটেছে। রাজনৈতিক,সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে শোষণমুক্ত শ্রেণীহীন সমাজ( বিরোধাত্নক শ্রেনী অর্থে) নির্মান করেছে। সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়ে সাম্যবাদের দিকে যাত্রা শুরু করেছিল । নামকরা পণ্ডিত রোঁমা রোলা , রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ,হেইস জি ওয়েলস (, H.G. Wells) ,বার্নার্ড শ, হেউলেট জনসন, এমিল লুডভিগ, অয়েবস প্রমুখ ব্যক্তিগণ সোভিয়েত ইউনিয়নের সামগ্রিক অবিশ্বাস্য অগ্রগতিতে মুগ্ধ হয়েছিলেন। সাম্রাজ্যবাদি সাগরে সোভিয়েত ইউনিয়ন যেখানে একটি দ্বীপের মত  সেখানেই একটি বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যাবস্থার পুর্ন বাস্তব অবস্থা বিরাজ করছিল।

এভাবেই দীর্ঘ বিশ বছর ধরে একদিকে প্রধানত আমরা মার্ক্সবাদের রাজনৈতিক, সামাজিক অর্থনৈতিক নীতিসমূহের সফল অভ্রান্ত কার্যকরি প্রয়োগ দেখি অন্যদিকে লেনিনীয় সাংগঠনিক নীতি থেকে মৌলিক ও প্রাথমিক বিচ্যুতি দেখতে পাই, নীতিসমূহের বিকৃতির প্রচেষ্টা এবং সমাজে এবং পার্টির মধ্যে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা, যৌথ নেতৃত্বের জায়গায় স্বৈরতন্ত্র ও ত্রাসের রাজত্ব কায়েমের প্রচেষ্টা  দেখতে পাই।

সঙ্গত কারনেই জিজ্ঞাস্য এটা কি করে সম্ভব? রাজনীতি, সমাজ ও অর্থনীতিতে যে সাফল্য সেটা কি সাংগঠনিক ও সমাজ জীবনে প্রতিফলিত হয় না? রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক অগ্রগতির যৌক্তিক অনুসিদ্ধান্ত হচ্ছে সাংগঠনিক গণতন্ত্র এবং সমাজ চেতনার বিকাষ । রাজনৈতিক,সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়ার যৌক্তিক অনুসিদ্ধান্ত হচ্ছে সাংগঠনিক প্রতিক্রিয়া, উদ্যোগহীনতা ,উ্দাসীনতা, নির্জীব এবং নিরানন্দ  জীবনধারা (routine)। এমন একটি সমাজে জীবন সঙ্গীত প্রতিধ্বনিত হয় না। কিন্তু আমরা সোভিয়েত ইউনিয়নে সেই সঙ্গীত শুনেছি। প্রশ্ন উঠে- মার্ক্সবাদি  লেনিনবাদি  রাজনৈতিক সাংগঠনিক লাইন কোন বিমুর্ত পারস্পরিক স্বতন্ত্র স্বাধীন ঘটনার( phenomena) বিবিধ সংগ্রহ নয় যা মিথস্ক্রিয়া করে না বা একে অপরকে বর্জন করে বরং এটি সকল কিছুর সম্মিলন, বহু দিক ব্যপ্ত করে সংগবদ্ধ আদর্শ ও অনুশীলন।  যদি তাই হয় তাহলে কি করে দীর্ঘ বিশ বছর ধরে  রাজনীতি ও সংগঠন দুই বিপরীত দিকে অবস্থান করে যেখানে রাজনীতিকে সফলভাবে পরিপুর্নতার হাতিয়ার হচ্ছে সাংগঠনিক নীতিমালা।  সাংগঠনিক রক্ষনশীলতা যেমন রাজনৈতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে তেমনি  রাজনৈতিক রক্ষনশীলতা সাংগঠনিক ক্ষেত্রে বাধা তৈরি করে- আর এই দ্বন্দ্বেই সংগঠনের পরিবর্তন হয় পরিবর্তনটা হয় এর নিয়মের মধ্যে।  এভাবেই সাংগঠনিক নীতি রাজনৈতিক অগ্রগতির সাথে ঐকতান তৈরি করে এবং এটাকে বাধাগ্রস্ত করে না।  কিন্তু যেখানে সাংগঠনিক নীতি এবং কর্মপদ্ধতি রাজনৈতিক অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে সেখানে রাজনীতি যেমন আগায় না তেমনি সংগঠনও পিছিয়ে পরে। (The conservatism of organisational policy acts as a brake in  political progress, similarly political conservatism also acts as a brake on organisational progress – it is in this contradiction that the organisation changes, there are changes made in its rules. In this way organisational policy comes into consonance with political progress and does not impede it. But where organisational policy and method of work impede political progress – there politics does not move forward and the organisation also remains backward.)

 

এভাবেই সোভিয়েত ইউনিয়নে রাজনীতি এগিয়ে যাচ্ছিল, বড় বড় সফলতা অর্জিত হচ্ছিল কিন্তু দীর্ঘ বিশ বছর ধরে সংগঠন এবং সাংগঠনিক নীতি পিছনে পড়ে ছিল- মহান ঐতিহাসিক পরিবর্তনের যুগে এটা পুরোটা অসম্ভবই মনে হয়। তাহলে কি আমাদের ধরে নিতে হবে সমাজ নিজ গতিতে সংকল্পে এগিয়ে যাচ্ছিল? এই প্রক্রিয়ায় কি মানুষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভুমিকা নেই? সমাজ কি নিয়তি দ্বারা পরিচালিত এবং মানুষও কি নিয়তির হাতে পুতুল? রাজনৈতিক স্বত্ত্বা তার ধরণ ও চরিত্র প্রতিফলিত হয় সাংগঠনিক নীতি, কার্যক্রম, ধরণ ও চরিত্রের মধ্যে। সংগঠন ও সাংগঠনিক নীতির  রূপ ও চরিত্র  প্রতিফলিত হয় রাজনৈতিক রূপ ও চরিত্রের রূপে।

এটা মার্ক্সবাদ হলে ক্রুশ্চেভ-মিকোয়ানের রিপোর্টটি নয়। হয় সোভিয়েত ইউনিয়নে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নি, জীবনের কোন ক্ষেত্রেই আগ্রগতি ঘটে নি এমনকি আজকের সময়েও নয় বরং সোভিয়েত ইউনিয়ন একটা বিশাল জেলখানা অথবা ক্রুশ্চেভ- মিকোয়ানের রিপোর্ট ভুল –এটা মার্ক্সবাদ অনুসারে রচিত নয় এবং উন্নত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে করা হয় নি। তাছাড়া অন্য আর একটা বিকল্প দাঁড়ায় যে ক্রুশ্চেভ-মিকোয়ানের রিপোর্ট সঠিক হলে  মার্ক্সবাদ ভ্রান্ত ।

ক্রুশ্চেভ-মিকোয়ানের রিপোর্ট যে দ্বিতীয় মৌলিক প্রশ্নের সাথে সম্পর্কিত তা হল ব্যাক্তির ঐতিহাসিক ভুমিকাজনিত প্রশ্ন।

জনতা, পার্টি, কেন্দ্রিয় কমিটি ও পলিটব্যুরোর সাথে তার কোন যোগাযোগ ছিল না। তিনি কখন কেন্দ্রিয় কমিটি বা পলিটব্যুরোর সভা আহবান করেন নি। একাই সিদ্ধান্ত নিতেন এবং সে মোতাবেক ইস্যু করতেন।

জনগণ, পার্টি এবং সমস্ত কিছুকে অস্বীকার করে , সমালোচনা পর্যালোচনার সুযোগ বন্ধ করে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত স্বাধীন চিন্তাদর্শন, তত্ত্ব এবং কর্মপদ্ধতির উপর ভিত্তি করে যদি  কোন একক ব্যক্তি যখন কিনা গোটা বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এর বিরুদ্ধে অবস্থানরত একটা ব্যাপক পিছিয়ে পড়া সমাজকে উন্নয়ন,সমৃদ্ধি এবং ক্ষমতার এমন উচ্চতায় তুলে আনতে পারে, যদি কেবলমাত্র একক ব্যক্তির তত্ত্বে সমাজতন্ত্র অর্জিত হয়ে সাম্যবাদের দিকে  অগ্রসর হয় ,একক ব্যক্তির নীতি , কার্যপদ্ধতি ও তত্ত্বের ভিত্তিতে সমাজতন্ত্র যদি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শক্তিশালী হয়ে সাম্রাজ্যবাদকে পরাস্ত করতে পারে তাহলে বলতেই হবে মার্ক্সবাদ ভুল, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ভুল। তাহলে কেনইবা যৌথ নেতৃত্ত্ব ও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার উপর এত জোর কেনইবা ব্যাক্তিপুঁজাবাদের বিরুদ্ধে এত হুঙ্কার? জনতার উপরে অধিষ্ঠিত হয়ে তাদেরকে ইতিহাসের আস্তাকূড়ে ফেলে দিয়ে যদি কোন একক কতৃত্বশালী ব্যাক্তি সামাজতন্ত্রের ঊজ্জ্বল ইতিহাস রচনা করতে পারে তাহলে তার সর্বোত্তম প্রকাশ হবে স্বয়ং স্তালিন। স্তালিন সমস্ত চুলচেরা তাত্ত্বিক যুক্তিকে প্রত্যাখ্যান করে তার কাজের মাধ্যমে ঐতিহাসিক বস্তুবাদকেই অস্বীকার করেছে।এখন আমরা আদর্শবাদিদের সাথে সুর মিলিয়ে বলতে পারি বিশাল জনগোষ্ঠী শুধুমাত্র ইতিহাসের কাচামাল হিসাবেই কাজ করে। বিশাল ব্যাক্তিত্বই সমস্ত কিছু, বিশাল জনগোষ্ঠী কিছুই না।

সুতরাং ক্রুশ্চেভ-মিকোয়ান রিপোর্ট সঠিক হলে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ ভুল, ঐতিহাসিক বস্তুবাদ ভুল।

ক্রুশ্চেভের রিপোর্ট অনুসারে সোভিয়েত ইউনিয়নের অসংখ্য সফলতার জন্য সোভিয়েত জনগনের অতুলনীয় আন্তত্যাগ ও দেশপ্রেমের ভূয়সী প্রসংসা থাকলেও সমস্ত ব্যর্থতার জন্য স্তালিনকেই দায়ী করা হয়েছে।

ফ্রেন্সরা যেমন বলে থাকে তাদের জাতি অকস্মাৎ হাতছাড়া হয়ে গেছে এক্ষেত্রেও এমনটা বলা অত্যুক্তি হবে না। জাতি এবং নারী অরক্ষিত প্রহরে  রক্ষা পায় না যে সময় ধরে প্রথম অভিযাত্রিক আসে সে সবকিছু তছনছ করে দিতে পারে। এরকম কথার ফেরে ধাঁধাটির সমাধান হয় না কিন্তু শুধুমাত্র অন্যভাবে একে রূপ দেয়া যায়। এখনও ব্যাখ্যার দাবি রাখে কি করে ৩৬ মিলিয়ন মানুষের জাতি হতভম্ব হয়ে বিনা বাধায় উচ্চ শ্রেনির তিন প্রতারকের কারনে  বন্দিত্ব মেনে নেয়। (It is not enough to say, as the French do, that their nation has been taken by surprise. A nation and a woman are not forgiven the unguarded hour in which the first adventurer that came along could violate them. The riddle is not solved by such turns of speech, but merely formulated in  another way. It remains to be explained how a nation of thirty-six millions can be surprised and delivered unresisting into captivity by three high class swindlers. (K. Marx and F. Engels,Selected Works, Vol. 1, Bombay, 1944, p. 298).

মার্ক্স বোঝাতে চেয়েছেন যে কেবল গুটিকয়েক মানুষ এত বড় দেশকে ভুলপথে চালিত করতে পারেনা এবং শুধুমাত্র তাদের কাঁধে দোষ চাপিয়ে  কেউ দায় এড়াতে পারে না। উপরের বাক্যবন্ধের মাধ্যমে কার্ল মার্ক্স ফ্রান্সে ঘটে যাওয়া ঘটনার ঐতিহাসিক বাস্তবতা তুলে ধরে পান্ডিত্যপুর্ন বিশ্লেষণ রাখলেন। এটিই নির্দিষ্টভাবে ঐতিহাসিক বস্তুবাদী বিচারধারা। অর্থাৎ মূল বিচারধার আলোকেই বিশ্লেষণ করতে হবে সমকালীন সমাজের গতিধারা এবং সফলতা, ব্যর্থতা, অর্জন, ঘাটতি এবং ব্যাক্তির ভুমিকা ও অবদান। ব্যাক্তির ভূমিকা ইতিহাসের আলোকে পর্যালোচনা করা হচ্ছে মার্ক্সবাদের মৌলিক নীতি আর ব্যাক্তিকেন্দ্রিক অবস্থান থেকে পর্যলোচনা করা হচ্ছে মার্ক্সবাদ বিরোধী বুর্জোয়া ভাবধারা ।

সেটাই  মার্ক্সবাদী এবং ক্রুশ্চেভ গোষ্ঠীর মধ্যে মৌলিক চিন্তার পার্থক্য।

সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যাবস্থার সীমাবদ্ধতা ঘাটতির খবর নিতে গেলে জানা যাবে কি উচ্চ মূল্য দিতে হয়েছে সোভিয়েত ব্যাবস্থাকে এবং জনতাকে যারা সমস্ত দিক থেকে বিজয়ের মনোভাব নিয়ে উন্নয়ন অগ্রগতি ঘটিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদের অসম বিকাষের কারনেই এক দেশে সমাজতন্ত্র সম্ভব আর সোভিয়েত ইউনিয়নই তার প্রমাণ। কিন্তু এক দেশে সমাজতন্ত্র মানে বিশাল সাম্রাজ্যবাদী সাগরে এক ফোঁটা জল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বিজয় এবং কতিপয় দেশে জনগণতান্ত্রিক রাস্ট্রের  অভ্যুত্থানের পূর্ব পর্যন্ত সোভিয়েত ইউনিয়ন সর্বদা আভ্যন্তরিন বা বাহ্যিক উভয় ক্ষেত্রে যুদ্ধাবস্থায় ছিল। একক দেশে যে এত দীর্ঘ সময় ধরে সমাজতন্ত্র গন্ডিবদ্ধ থাকবে সেটা লেনিন বা সমকালীন কোন কমিউনিস্ট নেতা ভাবতে পারেন নি। ইতিহাস যে বস্তুভিত্তি পরিবেষণ করে তাকে নিয়েই মানুষকে সমাজে  এবং পৃথিবীতে কাজ করতে হয় এভাবেই সমাজ পৃথিবী এগিয়ে যায় নতুন ইতিহাস সৃষ্টির মধ্য দিয়ে। ইতিহাস কারো শুভ ইচ্ছা এবং মোহাচ্ছন্ন ভাবনা ও স্বপ্ন দিয়ে তৈরি হয় না। সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা যে দীর্ঘকাল পুঁজিবাদ পরিবেষ্টিত যুদ্ধাবস্থায় ছিল সেটা তার ঐতিহাসিক সীমাবদ্ধতার কারনেই ছিল।

সকল রাজনৈতিক , সামাজিক ও অর্থনৈতিক দায়িত্ব জনতার উপর  ধাপে ধাপে ছেড়ে দিয়ে রাষ্ট্রের অবদমনের বিশেষ প্রাতিষ্ঠানিক রূপকে সামাজিকভাবে  ধাপে ধাপে অপ্রয়োজনীয় করে ফেলাটা মধ্যবর্তি সমাজতান্ত্রিক রাস্ট্র এবং শ্রমিক শ্রেনীর একনায়কত্ত্বের একটি মৌলিক কাজ। রাস্ট্রের তিনটি প্রধান স্তম্ভ হল- নির্বাহী বিভাগ,বিচার বিভাগ এবং আইন বিভাগ। সমাজতান্ত্রিক রাস্ট্রের অন্তর্বতি পর্যায়ের মোলিক দায়িত্ব হল এই তিন বিভাগের স্থায়ী আমলাতন্ত্রকে নিয়ন্ত্রনে (to keep in check)রাখা সাথে সাথে অবস্থিত সেনাবাহিনী, গোপন পুলিশ,গোয়েন্দা বিভাগ যেগুলো কোন সৃষ্টিশীল উৎপাদন করে না বরং সম্পুর্ন রাস্ট্রের উপর নির্ভরশীল তাদেরকে নিঃশেষ করে ফেলা। স্থায়ী আমলাতন্ত্রের পরিবর্তে জায়গা করে নিবে জনগণ কতৃক নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং সেনাবাহিনীর পরিবর্তে সশস্ত্র জনতা যারা বেঁচে থাকার জন্য রাস্টের উপর নির্ভর করবে না। একমাত্র তখনই জনগনের স্বাধীন মতামত তৈরি হবে এবং একমাত্র তখনই তাদের মতামত প্রকাশ করার যথাযথ পরিবেশ সৃষ্টি হবে। অর্থাৎ রাস্ট্র তাদের সাথে দলের সভ্যের সাথে যে আচরণ করে তা করতে পারবে না।

এই দীর্ঘ সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে এগুলোর কোনটাই সম্পন্ন করা সম্ভব হয় নি। সাম্রাজ্যবাদ দ্বারা পরিবেষ্টিত থেকে এখন আক্রমনের হুমকির মধ্য থেকে এক দেশে সমাজতন্ত্রকে রক্ষার প্রয়োজনে আধুনিক অস্ত্রে সজ্জিত রাস্ট্রের উপর নির্ভরশীল বিরাট সুশিক্ষিত বাহিনীর প্রয়োজন রয়ে গেছে। এক দেশে সমাজতন্ত্রকে দ্রুত এগিয়ে নিতে,  এরকম একটি বিশাল ও অনুন্নত দেশের জন্য উন্নত পুঁজিবাদী রাস্ট্রের শুধু কাছাকাছি যেতে নয় তাদের অতিক্রম করার প্রয়োজনীয়তা ছিল ফলে কেন্দ্রিকতার উপর অতিরিক্ত জোর পরে গিয়েছিল। পরবর্তিতে একই কারনে  দক্ষ, আত্ন-উতসর্গের মনোভাবাপন্ন,আদর্শবান( দার্শনিক অর্থে নয়),কর্মঠ, যারা রাস্ট্রে, শিল্পে,কৃষিতে পার্টির প্রতি অনুরক্ত তাদের নিয়ে এক বিশাল বাহিনী গড়ে তোলা এবং তাদের উপর নির্ভর করার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছিল।

সেনাবাহিনী, গোপন পুলিশ,গোয়েন্দা বিভাগ যেগুলো কোন সৃষ্টিশীল উৎপাদন করে না বরং সম্পুর্ন রাস্ট্রের উপর নির্ভরশীল তাদের উপস্থিতি সমাজে সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিড়াট বাঁধা।  যারা জনগণের জীবনযাত্রার সাথে বা উতপাদনের সাথে  কোন যোগাযোগ  রাখে না সেই নথি ঠেলা আমলাতন্ত্রও (file-pushing bureaucracy) সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিড়াট বাঁধা।   সামগ্রিক গণতান্ত্রিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে বিড়াট বাঁধা।   এইভাবে একদিকে  সোভিয়েত ইউনিয়নে সামাজিক ও অর্থনৈতিক জীবনে, শিক্ষায় সংস্কৃতিতে এক অভূতপূর্ব উন্নতি ও অগ্রগতি দেখতে পাই  ,দেখতে পাই শ্রেণীহীন ( বিরোধাত্নক অর্থে) শোষণমুক্ত সামাজিক ব্যাবস্থা অন্যদিকে রাস্ট্রে এবং রাস্ট্রযন্ত্রে ছিল অত্যধিক কেন্দ্রিকতা ও আমলাতন্ত্র। এই দ্বন্দ্বটি নিহিত ছিল সোভিয়েত সমাজের জাতীয় ও সামাজিক বিকৃতির মূলে। মনে রাখতে হবে অগ্রগতির প্রশ্নে সোভিয়েত ইউনিয়নের  সামনে বিকল্প কোন পথ ছিল না। কেউ যদি আন্দ্রে জিদের( Andre Gide) মত  মোহ নিয়ে সমাজতান্ত্রিক রাস্ট্র পরিদর্শন করতে যায়, তাহলে তার স্বপ্ন ভেঙ্গে যেতে বাধ্য।

সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যর্থতার বিশ্লেষণে এতটুকু বলা যথেষ্ট নয় যে এটি   সমাজের লক্ষ মানুষের  পারস্পরিক সাংঘর্ষিক ভাবাদর্শ ও কার্যক্রমের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফল। মানুষ কেবলমাত্র ইতিহাসের পর্যবেক্ষক নয়। সে সরাসরি তার ক্ষমতা  শক্তি ইতিহাস সৃষ্টিতে ব্যাবহার করে। এখন পর্যন্ত ইতিহাস সৃষ্টিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ এভাবেই অবদান রেখেছে। এটি প্রত্যক্ষ অবদান হলেও সচেতন নয়। যে বাস্তব পরিস্থিতি তৈরি হয় লক্ষ মানুষের পারস্পরিক সাংঘর্ষিক ভাবাদর্শ ও কার্যক্রমের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার ফলে তার মৌলিক গতি ও বিকাষকে যে  ব্যাক্তি বা সংগঠন মূলগতভাবে বুঝতে পারে এবং সচেতনভাবে ঐতিহাসিক লক্ষ্য অর্জনে সমাজকে এগিয়ে নিতে  সংগ্রাম করে তিনি বা সেই  সংগঠনই নেতা। ইতিহাস সৃষ্টিতে ব্যাক্তির যে ভূমিকা মুছে ফেলা যায় না এটি তাই। ফলে ইতিহাসের অনিবার্য অগ্রসরের ডাক দিয়ে সেখানে ব্যর্থতা বা ঘাটতি থাকলে তার জন্য নেতা বা সংগঠন দায় এড়াতে পারে না। ঘটনা ঘটার পর মানুষ শেখে এই যুক্তি প্রচার করে  মিকোয়ানের মত নেতা দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছে । এটা লক্ষ লক্ষ সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে সত্য হতে পারে কিন্তু আমরা দার্শনিক জ্ঞানের প্রশ্নে আলোচনা করছি। ঘটনা ঘটে যাওয়ার পরে প্রতযকে বুঝে। কিন্তু নেতৃত্ব সেখানেই নিহিত যারা ঘটনার আগেই বস্তুর গতি ও বিকাষ পুর্বানুমান করতে পারে বিরুদ্ধ গতি ও বিকাষকে অনুকূলে আনার জন্য সাবলীল ও যথাযথ শর্ত তৈরির জন্য সংগ্রাম করে। এখানেই সুনির্দিষ্টভাবে নেতা ও নেতৃত্বের প্রয়োজনীয়তা  এবং এভাবেই যে দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ বিকষিত হয়েছে সেক্ষেত্রে আমাদের উপলব্ধি গড়ে তুলতে সহযোগিতা করার জায়গা থেকে।

সুতরাং একদিকে আমরা সমাজতান্ত্রিক সমাজের অগ্রগতি দেখতে পাই অন্যদিকে সেনাবাহিনী,অতিরিক্ত কেন্দ্রিকতা,নির্বাহী ও আইন বিভাগে আমলাতন্ত্র যার ফলশ্রুতিতে সোভিয়েত সমাজে, রাস্ট্রে এবং জীবনে অবশ্যম্ভাবীরুপে ব্যর্থতা ও ঘাটতি এবং বিকৃত বিকাষ( distorted development) সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন আসে  এই ঘটনাসমূহের জন্য স্তালিন কি নেতা হিসাবে যথেষ্ট সজাগ ও সতর্ক ছিলেন এবং অনুকূল শর্তের জন্য সংগ্রাম করেছেন কিনা? শুধু এতটুকু মাত্রা পর্যন্ত তাকে দায়ী করা যায় কোনভাবেই সকল ব্যার্থতা ঘাটতির জন্য তাকে দায়ী করা যায় না। সব প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সোভিয়েত সমাজের বিকাষ কিছুটা বিকৃত ও একপেশে হতে বাধ্য ছিল- এই সত্যটুকু ঢেকে রাখার কোন কারন নেই। কিন্তু গুরুত্বপুর্ন প্রশ্ন হল এই একপেশে অবস্থানকে মোকাবেলায় কতটুকু প্রচেষ্টা ছিল এবং এক্ষেত্রে কেবল দায় বর্তানোর প্রশ্নটি আসে।

ক্রুশ্চেভ মিকোয়ান চক্র যদি ব্যক্তি ও রাস্ট্রের ব্যর্থতা ও ঘাটতি বিশ্লেষণে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের মূলনীতিকে গ্রহন করত তাহলে স্তালিন এবং সমাজতন্ত্রকে বিশ্বের সামনে কলঙ্কিত  করতে পারত না। তারা ব্যক্তিগত আক্রমণ করত না। কারণ এটা তাদের বুর্জোয়া ব্যক্তিকেন্দ্রিক বিশ্লেষণ ফলে  তাদেরকে মিথ্যাচার এবং বিকৃত ইতিহাসের আশ্রয় নিতে হয়েছে।

কিন্তু মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ অজেয়। ব্যাক্তির শুভ ইচ্ছা নিরপেক্ষভাবে ঐতিহাসিক বস্তুবাদের কার্যকারিতা আছে। ইতিহাস  ঐতিহাসিক বস্তুবাদের নীতিকে এবং অবশ্যই স্তালিনের যথার্থতা ও অবদানকে ঘোষণা করবে ।

 

 

 

 

সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি এবং মার্ক্সবাদ-বিরোধী ক্রুশ্চেভ গোষ্ঠীর সংশোধনবাদী ২০তম কংগ্রেসকে প্রত্যাখ্যান কর মার্ক্সবাদ লেনিনবাদকে হাতিয়ার কর

 ১৯৬০ সালের নভেম্বরে মস্কোতে অনুষ্ঠিত ৮১ পার্টির সভায় আলবেনিয়ার প্রতিনিধি হিসাবে এনভার হোক্সা  এই বক্তব্য রাখেন ।

     ভুমিকা  

১৯৬০ সালের নভেম্বরে মস্কোতে অনুষ্ঠিত ৮১ দলের সভায় কমরেড এনভার হোক্সা তার প্রদত্ত ভাষণে আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলনে প্রধান  সমস্যাগুলো   বিরাজ করছে তা নিয়ে বিষদ বিশ্লেষণ তুলে ধরেন এবং  মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদকে দৃঢ়ভাবে তুলে ধরেন( uphold)।নীতিগত লড়াইয়ে  এই বক্তব্যটি একটি গুরুত্ত্বপুর্ন ধাপ যা দিয়ে আলবেনিয়ার লেবার পার্টি আধুনিক সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে এবং আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলন এবং শ্রমিক আন্দোলনের ঐক্যকে সংহত করেছে। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির বিংশত কংগ্রেসের অব্যবহিত পরেই আলবেনিয়ার লেবার পার্টি ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদী দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। আলবেনিয়ার লেবার পার্টি   শুরুর দিকে সরাসরি খোলামেলা  লড়াই না চালালেও সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটিকে তাদের আপত্তির কথা জানিয়েছিল। আলবেনিয়ার পার্টি সর্বদাই সোভিয়েত ইউনিয়নের সাথে তাদের মতপার্থক্য প্রকাশ করাকে এড়িয়ে চলেছে যাতে কোনভাবেই সমাজতন্ত্রের শ্ত্রুর হাতে তারা হাতিয়ার তুলে না দেন সেই বিবেচনায়। অন্যদিকে ক্রুশ্চেভের আসল মতলব না জানা পর্যন্ত আলবেনিয়ার পার্টি কমরেডসুলভ চেতনায় আলাপ-আলোচনা,শলা পরামর্শের ভিত্তিতে পরস্পরের মতপার্থক্য দূর করার চেষ্টা করেছে। একটা নীতিতে অবস্থান করে এই পার্টি সংগ্রাম করেছে আশা করেছিল সোভিয়েত নেতারা তাদের ভুল বুঝে সঠিক পথে আসবে।

আলবেনিয়ার পার্টির কাছে সোভিয়েত সংশোধনবাদের বৈশিস্ট্য বেশি করে স্পষ্ট হচ্ছিল। যত তাদের বিশ্বাসঘাতকতা ধরা পরছিল  ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদের মুখোশ খুলে দিয়ে তাকে পরিপুর্নভাবে পরাস্ত করার জন্য ততই লড়াই জটিল এবং অমিমাংসিত হচ্ছিল।

১৯৬০ সালের জুন মাসের বুখারেস্ট মিটিঙয়ে মার্ক্সবাদ লেনিনবাদের মূলনীতি রক্ষায় আলবেনিয়ার লেবার পার্টি  এগিয়ে  এল এবং ক্রুশ্চেভীয় সংশোধনবাদকে চিৎকার করে থামিয়ে দিল যে সংশোধনবাদ চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সহ সারা সাম্যবাদী আন্দোলনের বিরুদ্ধে ভয়ানক ষড়যন্ত্র করছে। এই মিটিঙয়ের পরে সোভিয়েত সংশোধনবাদী নেতারা আলবেনিয়ার পার্টির বিরুদ্ধে ব্যাপক আক্রমন পরিচালনা করে যাতে করে তারা সোভিয়েতের লাইন এবং কর্মকান্ডকে সমর্থন দিতে বাধ্য হয়। এরকম পরিস্থিতিতে আলবেনিয়ার লেবার পার্টি ভালভাবে বুঝতে পারে যে আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলন প্রশ্নে তাদের যে সঠিক অবস্থান আছে তাকে সর্বোচ্চ সাহস আর স্থিরসংকল্পের সাথে রক্ষা করতে হবে। আর এটাই তারা করেছিল  ১৯৬০ সালের নভেম্বরে মস্কোতে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে ।

এই সম্মেলনে কমরেড এনভার হোক্সা আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলন সম্পর্কে এবং এখান থেকে উদ্ভূত মতপার্থক্য সম্পর্কে তাদের নীতিগত অবস্থান খোলাখোলি সাহসের সাথে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের আলোকে তুলে ধরেন এবং সংশোধনবাদী  নিকিতা ক্রুশ্চেভ  গোষ্ঠীর তীব্র সমালোচনা করেন । সমালোচনা করেন তাদের মার্ক্সবাদবিরোধী ভ্রান্ত চিন্তা ও কাজের এবং আলবেনিয়ার পার্টির আভ্যন্তরীণ বিষয়ে তাদের হিংস্র হস্তক্ষেপ এবং এই পার্টির উপর যে জঘন্য আক্রমণ তারা শুরু করে ছিলেন।

আলবেনিয়ার পার্টি নীতিগত সমালোচনা শুরু করেছিল সাম্যবাদী আন্দোলনের এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের ঐক্যকে রক্ষার তাগিদে। কারন ভুল ধরিয়ে না দিলে, সোজাসাপ্টা সমালোচনা না করে ভুল সংশোধন করে মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী লাইনে না আস্তে পারলে ঐক্য হতে পারে না।

মিটিঙয়ে ক্রুশ্চেভ গোষ্ঠী তাদের বিরুদ্ধে আনীত সংশোধনবাদ এবং বিভাজনের কর্মকান্ড সম্পর্কিত অভিযোগ অস্বীকার করে। কিন্তু তাদের সেই চেষ্টা বিফল হয়।

আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলনের সকল সমস্যাকে কেন্দ্র করে  আলবেনিয়ার লেবার পার্টির সুনির্দিস্ট এবং নীতিগত অবস্থান ব্যক্ত করার পরে চীনের প্রতিনিধি তাদের বক্তব্য রাখলে গোটা সম্মেলনের সকল প্রতিনিধি একই দিকে অথবা অন্য দিকে বক্তব্য রাখতে বাধ্য হয়। পরিস্থিতিকে মোকাবেলা করতে গিয়ে সংশোধনবাদীরা আলবেনিয়া এবং চীনকে নোংড়া আক্রমণ করার মধ্য দিয়ে নীতিগত বিষয়ে আলোচনা থেকে ভিন্ন দিকে আলোচনা ঘুড়িয়ে দেয়। কিন্তু এই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ এবং আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলনের ঐক্য রক্ষায় আলবেনিয়ার লেবার পার্টির আন্তর্জাতিকতাবাদী নীতিগত অবস্থান চীন কতৃক সমর্থিত হওয়ার পর আরো কিছু পার্টি সমর্থন দেয়। ক্রুশ্চেভয়ীয় সংশোধনবাদী চক্র পিছু হটতে বাধ্য হয়।

মস্কো সম্মেলনের  সফল পরিনতির জন্য কমরেড এনভার হোক্সার বক্তব্য বিশেষ ভুমিকা পালন করেছিল। আলবেনিয়া, চীন এবং অন্যান্য পার্টি যাদের দৃঢ়তার জন্য মস্কো ঘোষনা অনুমোদিত হয়েছিল তাদের ধন্যবাদ। ঘোষনায় কিছু ভুল সিদ্ধান্ত এবং ভান্তিকর থিসিস অন্তর্ভুক্ত হয়। আলবেনিয়ার লেবার পার্টি যা নিয়েও তাদের ভিন্নমত তুলে ধরে। সাধারনভাবে বিষয়বস্তুর সঠিকতার কারনে আলবেনিয়ার লেবার পার্টি ঘোষনায় স্বাক্ষর করে। মার্ক্সবাদ লেনিবাদের মৌলিক নীতির সাথে যুক্ত এমন মূল প্রশ্নে ছাড় না দিয়ে ঐক্যের প্রয়োজনে আংশিক বিষয়ে ছাড় দিয়েছে।

আলবেনিয়ার মত ছিল যদি সৎ বিশ্বাসে ঘোষনাকে ধারন করা হয় তাহলে আন্তর্জাতিক আন্দোলনে ওইক্য প্রতিষ্ঠিত হবে। শত্রুদের কাছে প্রকাশ না করে পারস্পরিক মতভিন্নতা যদি মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী রীতিতে সমাধান করার চেষ্টা থাকে তাহলে সম্ভব হবে। এজন্যই আলবেনিয়ার লেবার পার্টি কমরেড এনভার হোক্সার সম্মেলনে প্রদত্ত বক্তব্য প্রকাশ করা হয় নি এবং অনুমোদিত ঘোষনায় তারা অটল ছিলেন।

সম্মেলনে প্রদত্ত এনভার হোক্সার প্রদত্ত বক্তৃতা থেকে এটা স্পষ্ট যে তখন থেকে পরবর্তি সময়ে তারা বুর্জোয়া এবং সংশোধনবাদী মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়ে যাবেন। তাসত্ত্বেও লড়াইটাকে তখন এতোটা গভীর মনে হয়নি যে এরই যৌক্তিক পরিনতি হবে মার্ক্সবাদ লেনিনবাদ বনাম সংশোধনবাদের লড়াই। সোভিয়েত সংশোধনবাদী নেতারা দলত্যাগী বিশ্বাসঘাতক গ্যাং এ পরিনত হওয়ার মধয দিয়ে অধঃপতিত হবে। এই সমগ্র দলিলটা সে সময়ের এবং পরিস্থিতির সিলমোহর । কোন পরিমার্যনা ছাড়াই এটা প্রকাশ করা হল।

আলবেনিয়ার লেবার পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির ইন্সটিটুইট অব মার্ক্সসিস্ট লেনিনিস্ট স্টাডিস 

________________________________________________________________________

প্রিয় কমরেডস,

কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কাস পার্টির  এই সম্মেলন আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী আন্দোলনে এক ঐতিহাসিক গুরুত্ত্বপুর্ন বিষয়। কারন এটা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির বিষদ  বিশ্লেষণ হাজির করছে, সফলতা এবং ভুলের ব্যালান্স সিট তৈরি করেছে যাকে আমরা আমদের আলোচনার মাধ্যমে যাচাই করে নিতে পারি ,সমাজতন্ত্র,সাম্যবাদ ও শান্তির আরো সাফল্যের প্রয়োজনে কোন লাইন আমাদের গ্রহন করা উচিত তার সুস্পষ্ট ধারনা দিতে সাহায্য করবে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবির ইতি মধ্যেই বিশ্বে একটি প্রতিষ্ঠিত ঘটনা।সাধারণভাবে সাম্যবাদী আন্দোলন ব্যাপ্তি পেয়েছে,শক্তিশালী হয়েছে ,গতি পেয়েছে। মানবজাতিকে সমাজতন্ত্র তথা শান্তির পথে চালিত করার জন্য সারা দুনিয়াব্যাপি কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কাস পার্টি বিশাল শক্তিশালী হয়েছে।

প্রস্তুতকৃত খসড়া বিবৃতিতে জোর দেয়া হয়েছে যে সাম্রাজ্যবাদী শিবিরের চেয়ে সমাজতান্ত্রিক শিবির অনেক বেশি শক্তশালী হয়েছে। যেখানে  সাম্রাজ্যবাদ প্রতিদিন দুর্বল হচ্ছে ক্ষয়ে যাচ্ছে সেখানে সমাজতন্ত্র দিনে দিনে উচ্চতায় উঠছে আরো শক্তিশালী হচ্ছে। আমরা আমাদের সমস্ত উপায় সকল ক্ষমতাকে প্রয়োগ করে এই পদ্ধতিকে গতিশীল করব। এটা তখনই সম্ভব হবে যদি আমরা বিশ্বসততার সাথে অবিচলিতভাবে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদকে সঠিকভাবে প্রয়োগ করি। অন্যথায় আমরা এই প্রসেসকে গতিহীন করে ফেলব কারন আমাদের মোকাবেলা করতে হবে আমেরিকার নেতৃত্বে ভয়ংকর সামারজ্যবাদী শত্রুকে যাকে অবশ্যই পরাস্ত করে ধ্বংস করতে হবে।

সাম্রাজ্যবাদ যেখানে শান্তির বিরুদ্ধে গিয়ে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে সেখানে আমরা শান্তি চাই। আমাদের অবশ্যই সকল শক্তি দিয়ে বিশ্বযুদ্ধকে প্রতিহত করে বিশ্বের জন্য ন্যায়, গনতন্ত্র শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদকে শক্তিহীন( disarm) করতে পারলেই এটা সম্ভব হবে। সাম্রাজ্যবাদ স্বেচ্ছায় অস্ত্র ফেলে দেবে না। এরকম কোন কিছুতে বিশ্বাস করা নিজেকে এবং অন্যকে ধোকা দেয়া।  তাই সাম্রাজ্যবাদকে মোকাবেলা করতে হবে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিশাল অর্থনৈতিক, সামরিক, নৈতিক, রাজনৈতিক এবং আদর্শিক শক্তি দিয়ে সাথে সাথে গোটা দুনিয়ার মানুষের ঐক্যবদ্ধ শক্তির মাধ্যমে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির যুদ্ধ প্রস্তুতিকে যে কোন মূল্যে ভন্ডুল করা উচিৎ ।

শান্তিপ্রিয় মানুষের কাছে সাম্রাজ্যবাদ   কিভাবে হুমকি আলবেনিয়ার লেবার পার্টি তার জনগনের কাছে কখনও  তা গোপন রাখেনি রাখবেও না। আমরা আপনাদের আশ্বস্ত করতে পারি যে যে আলবেনিয়ার মানুষ যুদ্ধকে ঘৃনা করে তাদেরকে আমাদের পার্টির সঠিক অবস্থান দিয়ে ভয় দেখান হয়নি। যতক্ষন সমাজতান্ত্রিক বিনির্মান আছে তারা হতাশ হয়নি অপেক্ষাও করেনি। তাদের ভবিষ্যত নিয়ে স্পষ্ট ধারনা আছে। পুর্ন আস্থা নিয়েই তারা কাজ করছে। সর্বদা প্রহরায় থেকে এক হাতে গাঁইতি অন্য হাতে রাইফেল নিয়ে তারা এগিয়ে চলেছে।

আমাদের মত হচ্ছে মার্কিনের নেতৃত্বে সাম্রাজ্যবাদের চেহারা  নির্দয়ভাবে রাজনৈতিক এবং আদর্শিকভাবে প্রকাশ করতে হবে। সাম্রাজ্যবাদকে কোন সময়েই খোসামোদ করা দয়া দেখানকে আমরা অনুমোদন করতে পারি না। নীতির প্রশ্নে সাম্রাজ্যবাদকে ছাড় দেয়া উচিৎ নয়। আমাদের  নিজেদের মধ্যে কৌশল সমঝোতা কাজে দিতে পারে কিন্তু শত্রুর সাথে নয় ।

নির্দয় শত্রুর মোকাবেলায় আমাদের জয়ি হতে হলে নিজেদের মধ্যে গভীর আদর্শগত মতভিন্নতা দূর করে পুর্ন ঐক্য তৈরি করতে হবে। এই ঐক্যের ভিত্তি হতে হবে মার্ক্সবাদ লেনিনবাদ  ভিত্তি হতে হবে  সমতা ,ভাতৃত্ত্ব , কমরেডসুলভ চেতনা এবং সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাবাদ। আমদের পার্টির মতামত হচ্ছে আমদের শুধু আদর্শগত বিভক্তি পরিহার করলেই হবে না আমাদের সকল বিষয়ে  ঐক্যবদ্ধ(unified political stand)     রাজনৈতিক  অবস্থান নিতে হবে। শত্রুর বিরুদ্ধে   সকল পার্টির   কৌশল ও কর্মপদ্ধতির ভিত্তি হতে হবে মার্ক্সবাদ লেনিনবাদ, সুনির্দিস্ট পরিস্থিতিতে সঠিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রেই শুধু না সামরিক কার্যকারিতার দিক থেকেও সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে আমাদের সমাজতান্ত্রিক শিবির সমস্ত দিক থেকে  বিড়াট এক শক্তিতে পরিনত হয়েছে। আমাদের সফলতার কেন্দ্রে, শক্তির কেন্দ্রে রয়েছে সোভিয়েত ইউনিয়নের বিশাল নৈতিক,রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামরিক শক্তি। শিল্প,কৃষি, শিক্ষা ও সংস্কৃতি, বিজ্ঞান এবং সামরিক ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়নের সাফল্য অভুতপুর্ব(exceptionally great)।একই  সাথে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অন্যান্য দেশে সফলতা অর্জনে তাদের রয়েছে অপরিমেয় সহযোগিতা।

খসড়া বিবৃতিতে সঠিকভাবেই তুলে ধরা হয়েছে যে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে যে বিশাল অক্ষয় সমাজতান্ত্রিক শিবির গড়ে উঠেছে সেটাই হবে বিশ্ব শান্তির জন্য চুরান্ত শক্তি। এটা সেই নৈতিক, রাজনৈতিক এবং আদর্শিক শক্তি যা গোটা দুনিয়ার মুক্তিকামী মানুষকে রক্তচোষা উপনিবেশ, সাম্রাজ্যবাদ এবং পুঁজিবাদের শৃংখল থেকে মুক্তির লড়াইয়ে প্রেরনা যোগায়। যারা পুঁজিবাদী শোষণ থেকে পুর্ন স্বাধীনতার লড়াই করছে তাদের জন্য এই শক্তি উদাহরণ এবং এই শক্তির অর্থনৈতিক সহযোগিতা তাদের উতসাহ যোগায়। আর এই কারনেই সোভিয়ে ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক শিবির সারা দুনিয়ার মানুষের ভরসার কেন্দ্রে পরিনত হয়েছে। এটা হয়েছে তাদের নৈতিক ,রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক খঁটির কারনে, হয়েছে মার্কিন,ব্রিটিস, ফ্রেন্স সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে বিশ্বস্ত এবং দৃঢ় অবস্থানের কারনে।

সারা দুনিয়ার মানুষ মুক্তি, স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ত্ব , সামাজিক ন্যায়বিচার ,সংস্কৃতি এবং শান্তির জন্য কামনা করে আর লড়াই করে। পুঁজিবাদ,সামন্তিয় প্রতিভূ এবং সাম্রাজ্যবাদের কারনে জনতার চাওয়াগুলি বন্দি হয়ে আছে। স্বাভাবিক কারনে পঁজিবাদ,সামন্তিয় লর্ড,সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ভীষণ তীব্রতা নিয়ে লড়াই করতে হবে। এটাও স্বাভাবিক(natural) যে এই লড়াইয়ে তারা মিত্র খুঁজবে। সোভিয়ে ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরই তাদের শক্তিশালী এবং বিশ্বস্ত মিত্র। সুতরাং, সাম্রাজ্যবাদ যখন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিরুদ্ধে বিচ্ছিন্ন তখন দুনিয়ায় শান্তি প্রতিষ্ঠা, নিরস্ত্রিকরন, সামাজিক অগ্রগতির সংগ্রামে সমাজতান্ত্রিক শিবির একা নয় বরং তাদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে  আছে  গোটা দুনিয়ার প্রগতিশীল মানুষ।

আমরা এমন এক সময়ে বাস করছি যখন উপনিবেশবাদের  পুরোপুরি ধ্বংস দেখতে পারছি। যে উপনিবেশবাদ মানুষকে উচ্ছেদ করত আজ তার উচ্ছেদ দেখছি। আফ্রিকা এশিয়ায় নতুন নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হচ্ছে। যে রাষ্ট্রসমূহে পুঁজি হচ্ছে চাবুক বারুদ হচ্ছে সর্বোচ্চ শাসন জনতার ঐক্যবদ্ধতায় এর পরিসমাপ্তি ঘটছে আর জনতা নিজেদের ভাগ্য নির্ধারন করছে। যে   জনতার সংগ্রাম এবং সোভিয়ে ইউনিয়ন ,চীনের জনতা এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অন্যান্য দেশের কারনে এই অর্জনগুলি সাধিত হল তাদের সকলকে ধন্যবাদ।

মার্ক্সবাদ লেনিনবাদের বিশ্বাসঘাতক, সাম্রাজ্যবাদের দালাল ষড়যন্ত্রকারীরা যেমন জসিফ ব্রজ টিটো যারা এই জনতা এবং নতুন গঠিত রাষ্ট্রগুলিকে তাদের স্বাভাবিক মিত্রদের থেকে বিচ্ছিন্ন করে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকার সাথে গাট বাধতে বিভ্রান্ত করার জন্য হাজার উপায়ে চেষ্টা করেছে। ষড়যন্ত্র করেছে তৃতীয় শক্তি নির্মানের নারকীয় স্কিম চালু করার।

আমরা লক্ষ্য করছি সাম্রাজ্যবাদের বিভক্তি, এর ভেঙ্গে পড়া এবং চুরান্ত মর্মবেদনা। আমরা যে সময়ে বাস করছি লরাই করছি সেটা হচ্ছে পুঁজিবাদ থেকে সমাজতন্ত্রে পৌছার অপ্রতিরোধ্য অন্তর্বর্তি কাল। কার্ল মার্ক্স এবং ভ্লাদিমির এলিস লেনিনের অসাধারন(brilliant) শিক্ষা যেগুলো কখন অচল হয় নি যা অনুশীলন করতে গিয়ে দৃঢ়ভাবে সমর্থিত হয়েছে যদিও  সংশোধনবাদীরা এগুলো অচল হয়েছে বলে দাবি করে।

বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদকে যে আঘাত করা হয়েছে তাতে সে আর তার স্বর্নযুগে নেই যেখানে এটি যেভাবে ইচ্ছা আইন করতে পারত। তার ভুমিকা তার ইচ্ছার বাইরে তার হাত থেকে পিছলে গেছে। তার এই ভুমিকা শুধু কথায় বা আলোচনায় ছিনিয়ে নেয়া হয়েছে তা নয়। এটা ঘটেছে দীর্ঘমেয়াদি রক্তাক্ত পড়াই এবং বিপ্লবের মধ্য দিয়ে যে বিপ্লব পুঁজিবাদই সর্বহারার উপর চাপিয়ে দিয়েছে জনগনের শক্তিতে বলীয়ান হয়ে যারা ক্ষুধা, দারিদ্র্য বিশ্ব দাসত্ব থেকে মুক্তির জন্য এই ব্যাবস্থাকে গুড়িয়ে দিচ্ছে। মহান সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে মহান লেনিনের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক অক্টোবর বিপ্লবের মাধ্যমে  এই উজ্জ্বল অধ্যায়ের সূচনা।

আমেরিকার নেতৃত্বে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ তার আগ্রাসনের শক্তিকে পরিকল্পনামাফিক সংগঠিত করছে অস্ত্রে সজ্জিত করছে এমনকি যখন তারা দেখতে পারছে তাদের ধ্বংস ঘনিয়ে আসছে, যখন গোটা দুনিয়ার মানুষের সাথে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের মত শক্তিশালী এবং দৃঢ় প্রতিপক্ষ তার সামনে। তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। যারা এগুলো দেখতে পারে না তারা অন্ধ। আর যারা দেখে না দেখার ভান করে তারা  সাম্রাজ্যবাদের সেবায় নিয়োজিত বিশ্বাসঘাতক ছাড়া কিছু নয়। আমদের মত করে বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠা ,নিরস্ত্রীকরণ এবং অন্যান্য আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধানে নানান প্রতিকূলতার সম্মুখীন হলেও হতাশ হওয়ার কিছু নেই এটাই আলবেনিয়ার লেবার পার্টির মত। আমরা জিতেছি, জয় করে চলেছি ভবিষ্যতেও  জিতব। এই কারনেই আমরা  আত্মবিশ্বাসী যে আমাদের চেষ্টা সফলতার জয়মাল্য পরবে।

কিন্তু আমরা মনে করি অতিরিক্ত অলীক আশাবাদ শুধু খারাপ নয় ক্ষতিকর বটে। যারা অস্বীকার করে ছোট করে দেখে ,আমাদের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামরিক এবং নৈতিক শক্তির উপর ভরসা করতে পারে না তারা পরাজয়বাদী । তাদের কমিউনিস্ট বলা যায় না। অন্যদিকে যারা আমদের শক্তিকে অনেক বড় করে দেখে, শত্রুর শক্তিকে খাটো করে দেখে আর ভাবে যে শ্ত্রুর মনোবল ভেঙ্গে গেছে তারা এখন আমাদের দয়ার উপরে বেঁচে আছে তারা বাস্তববাদী নয়। এরকম জটিল ও ভয়ানক পরিস্থিতিতে যেখানে আমাদের সর্বোচ্চ  সতর্ক থাকা দরকার, জনতার বিপ্লবী পদক্ষেপকে উচ্চশিখরে নেয়া দরকার, শিথিলতার বিরুদ্ধে, বিভক্তির বিরুদ্ধে, ভেঙ্গে যাওয়ার বিরুদ্ধে দম নেওয়ার বিরুদ্ধে অবস্থান দরকার সেখানে তারা( অবাস্তববাদীরা) মানবজাতিকে ধোঁকা দেয় ঘুম পাড়ায়।   “পানি ঘুমাতে পারে শত্রু নয়”  দীর্ঘ কষ্ট ভোগা জনতার এই প্রবাদকে মনে রাখা দরকার।

স্বচক্ষে কিছু ঘটনা দেখা যাক। ইউ এস নেতৃত্বে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদ তার অর্থনীতিকে যুদ্ধের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। নিজেদের অস্ত্রে সজ্জিত করছে। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ জার্মানি,জাপান সহ সকল মিত্র এবং অধিনস্তদের( satellites) সকল ধরনের অস্ত্রে পূন্সজ্জিত করছে। এটি সুচারুরুপে আগ্রাসী সামরিক বাহিনী  তৈরি করেছে, সমাজতান্ত্রিক শিবিরের চারদিকে এটি সামরিক ভিত্তি তৈরি করেছে এবং এখন করে চলেছে। পারমানবিক অস্ত্রের ভাণ্ডার গড়ে চলেছে, নিরস্ত্রীকরণে, পারমানবিক অস্ত্রের পরীক্ষা চালনায়  মানব ধ্বংসের নতুন নতুন উদ্ভাবন থেকে বের হতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে  । কেন তারা এগুলি করছে? বিয়ে বাড়িতে যাওয়ার জন্য? না, আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাওয়ার জন্য , সমাজতন্ত্র সাম্যবাদ  নির্মূল করার জন্য, জনতাকে বেঁধে ফেলার জন্য।

আলবেনিয়ার লেবার পার্টি মনে করে আমরা যদি এইভাবে বলি চিন্তা কর তাহলে নিজেদের এবং অন্যদের প্রতারনাই করব। জীবনের উত্থান পতনে ভয় পেলে আমাদের কমিউনিস্ট বলা যায় না। আমরা কমিউনিস্টরা যুদ্ধকে ঘৃনা করি। আমরা কমিউনিস্টরা মার্কিনি সাম্রাজ্যবাদের নারকীয় যুদ্ধংদেহী প্রকল্পকে শেষ পর্যন্ত লড়াই করে চুর্ন করে দিব। কিন্তু তারা যুদ্ধ শুরু করলে আমাদের উচিৎ হবে  প্রচন্ড আঘাতে (mortal blow) পৃথিবী থেকে সাম্রাজ্যবাদকে চীরতরে মুছে ফেলা। মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী পারমানবিক অস্ত্র দিয়ে জিম্মি করাকে আমাদের মোকাবেলা করতে হবে অর্থনৈতিক,রাজনৈতিক, নৈতিক এবং সামরিক শক্তির মাধ্যমে।

মারাত্নকভাবে অনিবার্য বিশ্বযুদ্ধকে প্রতিহত করতে হবে।  স্বপ্নে বিভোর থাকার কারনে অসতর্ক অবস্থার কারনে শত্রুরা আমাদের ধরাশায়ী করলে কেউ আমাদের ক্ষমা করবে না। শত্রুকে বিশ্বাস করলে তাকে শত্রু বলে ডাকা কেন। শত্রু শত্রুই থেকে যায় এবং বিশ্বাসঘতকতা( perfidious)  করে।  যারা শত্রুর উপর ভরসা করা শুরু করে তারা আজ হোক কাল হোক পরাজিত হবেই।

যা কিছু আছে তার সমস্তটা ব্যাবহার করে আমাদের যুদ্ধকে প্রতিহত করতে হবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের শান্তির নীতি ছিল এবং আছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং গনতান্ত্রিক সরকারগুলোর জাতিসমুহের মধ্যে উত্তেজনা দূর করার যে প্রস্তাব ছিল তা হচ্ছে অমিমাংসিত বিষয়গুলো আলাপ আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা যুদ্ধের মাধ্যমে না।

সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসী মনোভাবকে জনসম্মুখে হাজির করার জন্য সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের দেশসমূহের শান্তি নীতি গুরুত্ত্বপুর্ন ভুমিকা রেখেছে। এই ভুমিকা যুদ্ধবাজদের বিরুদ্ধে জনতাকে সংগঠিত করেছে, নির্যাতকদের বিরুদ্ধে মহান সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়েছে। এর শ্রেষ্ঠ প্রমাণ হল কিউবার নায়কচিত উদাহরণ, জাপানের জনতার সংগ্রাম, দক্ষিণ কোরিয়া এবং তুর্কিতে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলি। কিন্তু ততসত্তেও যে বিষয়গুলি আলোচনায় আছে তার অনেক সুনির্দিস্ট সমস্যা যেমন নিরস্ত্রীকরণ,শীর্ষ সম্মেলনের প্রস্তাব ইত্যাদির  এখন  সমাধান হয় নি বরং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ পরিকল্পিতভাবে অন্তর্ঘাত চালিয়ে যাচ্ছে।

এগুলো থেকে আমাদের কি সিদ্ধান্ত টানা উচিৎ ? আলবেনিয়ার লেবার পার্টি মনে করে সাম্রাজ্যবাদ বিশেষ করে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তার খোলস, বর্ন স্বভাব কোনটাই পালটায় নি। এরা আগ্রাসী, যতক্ষন সামান্য ক্ষমতা থাকবে(a single tooth left in its mouth)  ততক্ষন আগ্রাসন চালিয়ে যাবে।  এর আগ্রাসী স্বভাবের কারনে গোটা দুনিয়াকে যুদ্ধে ডুবিয়ে ফেলতে পারে। তাই, সম্পাদকীয় কমিটির সভায় আমরা জোর দিয়েছিলাম যে মানুষকে ভাল করে বুঝাতে হবে যে সারা দুনিয়াব্যাপি কিংবা বেশিরভাগ দেশে সমাজতন্ত্রের বিজয় ছাড়া যুদ্ধের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত কথা বলা সম্ভব না ( there is no absolute guarantee against world war)।মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করতে কোন রাখ ডাখ করে নি। তারা তাদের অস্ত্র বৃদ্ধি করছে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। সুত্রাং আমাদের সতর্ক থাকা দরকার।

শত্রুর বিরুদ্ধে নীতিগত বিষয়ে আমাদের ছাড় দেয়া উচিৎ না। শত্রু সমন্ধে কোন মোহ থাকা উচিৎ না কারন এতে করে আমাদের ভাল উদ্দেশ্যও খারাপ পরিস্থিতি তৈরি করবে। আমাদের বিরুদ্ধে পুনর্সজ্জিত হওয়া ছাড়াও তারা জনতার চেতনা ও মনকে ভোঁতা করার জন্য লাগামহীন প্রচারনা চালাচ্ছে। তারা দালাল চর( spies) নিয়োগে , চরবৃত্তিকে সংগঠিত করতে আমাদের দেশগুলিতে বিভক্তি ঘটাতে এবং বিড়াট ক্ষতি করতে কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করছে। বিশ্বস্ত দালাল বিশ্বাসঘাতক টটো গ্যাংকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কোটি কোটি ডলার আগেও দিয়েছে এখনও দিচ্ছে। এরা সবকিছু করছে আমাদের আভ্যন্তরীণ সংহতিকে দুর্বল করার জন্য, আমাদের ভিতরে বিভক্তির বীজ বুনতে ,প্রতিষ্ঠিত অঞ্চলসমুহকে দুর্বল এবং অসংগঠিত করতে ।

শান্তিপুর্ন সহাবস্থান( peaceful coexistence) নিয়ে অনেক কথা বলা হয়েছে। অনেকে এমন ধোঁয়াশা কথা বলেছেন যে চীন এবং আলবেনিয়া শান্তপুর্ন সহাবস্থানের বিরুদ্ধে। এরকম ক্ষতিকর এবং ভ্রান্তিকর চিন্তা চিরতরে বন্ধ করতে হবে। কোন সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কোন কমিউনিস্টই এই নীতির বিরোধীতা করতে পারে না পারে শুধু যুদ্ধবাজরাই। যতক্ষন সমাজতান্ত্রিক এবং পুঁজিবাদী রাষ্ট্র  পৃথিবীতে পাশাপাশি থাকবে ততক্ষন একটা বাস্তব প্রয়োজনে বিভিন্ন সামাজিক বিন্যাসের রাষ্ট্রের মধ্যে শান্তিপুর্ন অবস্থান থাকবে -এটা প্রথম মহান লেনিন তুলে ধরেছেন। লেনিনের এই মহান নীতির প্রতি বিশ্বস্ত থেকে আমরা সর্বদাই শান্তিপুর্ন সহাবস্থানের নীতিকে ধারন করেছি এবং এখনও ধারন করছি। এই নীতিতে থেকেই জনতার গুরুত্ত্বপুর্ন স্বার্থে সারা দিচ্ছি, সমাজতন্ত্রের অবস্থানকে আর সুসংহত করার জন্য সারা দিচ্ছি। আমাদের বৈদেশিক নীতির প্রধান ভিত্তিই হচ্ছে লেনিনের এই নীতি।

শ্রেনী সংগ্রাম ছেড়ে দিতে হবে এরকমটা যে আধুনিক সংশোধনবাদের অবস্থা তারা দাবি করে যে দুটি বিপরীত ব্যাবস্থার মধ্যে শান্তিপুর্ন অবস্থানের নীতি খাটে না। বিপরীতক্রমে, শ্রেনীসংগ্রাম অবশ্যই চালিয়ে যেতে হবে। সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদ এবং আধুনিক সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে রাজনোইতিক এবং আদর্শিক সংগ্রাম আরো বেশি তীব্র করা উচিৎ । লেনিনিয় শান্তিপুর্ন সহাবস্থানের নীতির প্রতিষ্ঠায় নিরন্তর সংগ্রামে সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নীতিগত কোন ছাড় নেই। পুঁজিবাদী দেশসমুহে ,উপনিবেশ  এবং অধিনস্ত দেশসমুহে শ্রেনী সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করতে আমদের আরো সহযোগিতা করা দরকার।

আমাদের মতে যে সমস্ত দেশ এখনও পুঁজিবাদী ব্যাবস্থায় আছে সেই দেশসমূহের কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কাস পার্টির উচিৎ হবে তাদের দেশের সাথে সমাজতান্ত্রিক দেশের শান্তিপুর্ন সহাবস্থানের জন্য লড়াই করা। এটি শান্তির অবস্থানকে শক্তিশালী করবে এবং সে সমস্ত দেশে পঁজিবাদের অবস্থানকে দুর্বল করবে। সাধারণভাবে , সে সমস্ত দেশে শ্রেনীসংগ্রামকে সহযোগিতা করবে। তাদের কাজ সেখানেই শেষ হবে না। এই সকল দেশে শ্রেনি সংগ্রামকে এগিয়ে নেওয়া, তীব্রতর করা শক্তিশালী করা জরুরী । কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে এবং বিশ্ব সর্বহারার মৈত্রিতে স্থানীয় সর্বহারার পরিচালনায় শ্রমিক জনতার ( laboring masses)  সাম্রাজ্যবাদকে অসম্ভব করে তুলতে হবে। এর যুদ্ধ করার এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতাকে চুর্ন করতে হবে, এর অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ছিনিয়ে নিতে হবে এবং পুরাতন ক্ষমতার পরিবর্তে জনতার নতুন ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। তারা কি সহিংস (violence) উপায়ে নাকি শান্তিপুর্ন সংসদীয় উপায়ে করবে? 

এই প্রশ্ন স্পষ্ট করা হয়েছে। কমরেড ক্রুশ্চেভের ২০ তম কংগ্রেসে বিভান্ত হয়ে সুবিধাবাদীদের খুশি করার দরকার ছিল না। লেনিনের স্পষ্ট থিসিস এবং সমাজতান্ত্রিক অক্টোবর বিপ্লব নিয়ে অনেক ব্যঙ্গ করার কেন দরকার পরল? আলবেনিয়ার পার্টির এই সম্পর্কে সম্যক ধারনা আছে এবং লেনিনের শিক্ষা থেকে তারা সরে যায় নি। রক্তক্ষরণ সহিংসতা ছাড়া এখন পর্যন্ত কোন মানুষ কোন সর্বহারা, কোন কমিউনিস্ট বা ওয়ার্কাস পার্টি ক্ষমতার কথা ভাবতে পারে নি। যে সকল কমরেড ভাবছেন রক্তক্ষরণ ছাড়া ক্ষমতায় যাওয়া যায় তাদের ধারনা ভুল ।তারা ভুলে যাচ্ছেন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সোভিয়েত ইউনিয়নের মহান সেনাবাহিনী কত রক্ত দিয়েছে।

আমাদের দল মনে করে দুটি সম্ভবনাকেই সামনে রেখে আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে, বিশেষ করে সহিংসতার পথে ক্ষমতা দখল। কেননা এই পথের প্রস্তুতি থাকলে দ্বিতীয় উপায়ে সফল হওয়ার সুযোগ থাকে। বুর্জোয়ারা স্তব( psalms)  গাওয়ার সুযোগ দিতে পারে  তারপর সে ফ্যাসিবাদী কায়দায় আক্রমণ করে তোমাকে চুর্ন করে দিবে। কারন তুমি তোমার ক্যাডারদের আক্রমণ করার প্রয়োজনীয় শিক্ষা দেও নি , কিভাবে বেআইনি উপায়ে কাজ করতে হবে তা তাদের শেখান হয়নি ,এমন কোন জায়গা তৈরি করতে পার নি যেখান থেকে নিজেদের রক্ষা করা যায় এবং কাজ চালিয়ে যাওয়া যায়। কি উপায়ে লড়াই করা যায় তাও জানা নেই। এই বেদনাদায়ক সম্ভাবনাকে পূর্বেই পন্ড করে দেয়া উচিৎ ।

আলবেনিয়ার লেবার পার্টি শান্তি এবং শান্তিপুর্ন সহাবস্থানের পক্ষে ছিল এখন আছে এবং থাকবে। লেনিনের শিক্ষা অনুসারে মার্ক্সবাদি লেনিনবাদি পদ্ধতিতে এবং মস্কোর শান্তির মেনিফেস্টোর ভিত্তিতে আমরা লড়াই চালিয়ে যাব। সাধারন নিরস্ত্রীকরণের জন্য এটি সংগ্রাম করেছে এখন করছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। সাম্রাজ্যবাদ, পুঁজিবাদের কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে এবং বুর্জোয়া মতাদর্শের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কোন অছিলায় কোন সময়েই আলবেনিয়ার পার্টির সংগ্রাম থামবে না। আধুনিক সংশোধনবাদ বিশেষ করে যুগোস্লাভিয়ার টিটোয়িক সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে তিক্ত , বিরামহীন আপসহীন লড়াইয়ে ছেদ ঘটাবে না। কিছু কমরেড এই বলে আমাদের নিন্দা করতে পারেন যে আলবেনিয়ানরা গোঁয়ার , গরম রক্তবিশিস্ট, দলবাজ, গোঁড়া যা খুশি তাই কিন্তু আমরা সকল অভিযোগকে প্রত্যাখ্যান করছি এবং তাদের বলতে চাই যে আমরা এই অবস্থানগুলি থেকে বিচ্যুত হয়নি কেননা এগুলি মার্ক্সবাদি লেনিনবাদি অবস্থান।

তারা বলে আমরা যুদ্ধের পক্ষে আর  সহাবস্থানের বিরুদ্ধে। কমরেড কজলভ আমাদের পছন্দ বেধে দিয়েছে যে হয় সহাবস্থানের পক্ষ  নিতে হবে যেমনটা তার উপলব্ধি অথবা সাম্রাজ্যবাদের আনবিক বোমার আঘাতে আলবেনিয়া ধ্বংসস্তূপে পরিনত হবে । একটাও মানুষ বেঁচে থাকবে না। এখন পর্যন্ত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের কেউ আলবেনিয়ার জনতাকে আনবিক বোমার ভয় দেখায় নি। কিন্তু সোভিয়েত ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতিমন্ডলির সদস্য কার উদ্দেশ্যে এরকম করে বললেন? একটা ছোট নায়কোচিত দেশকে, জনতার বিরুদ্ধে যারা শতাব্দি ধরে বর্বরতার বিরুদ্ধে অসংখ্য শত্রুর বিরুদ্ধে লড়াই করেছে কার সামনে কুর্নিশ করেনি ,সেই ছোট্র দেশ এবং তার জনতাকে যারা হিটলার এবং ইতালির ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে নজিরবিহীনভাবে  সাহসের সাথে লড়াই করেছে, যারা সোভিয়েত ইউনিয়নের গৌরব ইতিহাসের সাথে একাকার, এমন একটা পার্টিকে যারা মার্ক্সবাদ লেনিনবাদ এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের পার্টিকে বিশ্বস্তভাবে, ধারাবাহিকভাবে এবং শেষ পর্যন্ত মেনে চলে । কিন্তু কমরেড ফ্রল কজলভ আপনি আপনার সম্বোধনে ভুল করেছেন । আপনার ভুল হিসাবকে মানার জন্য আমাদের ভয় দেখাতে পারেন না। আপনার মত যারা আলবেনিয়ার লেবার পার্টি এবং তার জনতার সাথে ভীষণ বাজেভাবে নির্লজ্জ আচরন করে তাদের সাথে মহান লেনিনের পার্টিকে আমরা গুলিয়ে ফেলি না। আলবেনিয়া সর্বদা সোভিয়েত ইউনিয়ন সামাজতান্ত্রিক শিবিরের অন্যান্য দেশ এবং শান্তিপৃয় দেশসমুহের সঠিক এবং শান্তিপুর্ন  প্রস্তাবকে সমর্থন করবে।

আলবেনিয়ার লেবার পার্টি তাদের প্রচেষ্টাকে ,সকল সুযোগ এবং বাধ্যবাধকতকে কাজে লাগিয়ে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের ঐক্য তথা মার্ক্সবাদি লেনিনিবাদি ঐক্যকে সুদৃঢ় করবে। আলবেনিয়া সমাজতান্ত্রিক শিবির থেকে সমাজতান্ত্রিক জনতার ভাতৃত্ত্ব বন্ধন থেকে বিচ্ছিন্ন হবে এরকম ভাবনা অযৌক্তিক। সমাজতান্ত্রিক শিবিরে অবস্থান করার জন্য আলবেনিয়া কারো কাছে ঋনি নয়। এটা সম্ভব হয়েছে আলবিনিয়ার জনতা এবং তাদের দলের রক্ত ঘামে, তার কর্মকান্ডে, তাদের আত্মত্যগে ,সরকার ব্যাবস্থার কারনে এবং মারক্সবাদ লেনিনবাদ অনুসরণ করে চলার জন্য। কিন্তু এর মানে এই না যে কেউ ভাববে আলবেনিয়া যেহেতু একটা ছোট দেশ তার পার্টিটা ছোট সুতরাং অন্যরা  যা বলবে তা শুনতে হবে এমনকি আলবেনিয়া যদি বুঝে অন্যরা ভুল বুঝেছে তারপরেও।

আমি আগেও বলেছি যে আলবেনিয়ার পার্টি মনে করে সমাজতান্ত্রিক শিবির যা মার্ক্সবাদ লেনিনবাদের ভিত্তিতে পরিচালিত তার একটা উদ্দেশ্য আছে । এর নিজস্ব নীতি ও কৌশল থাকা দরকার যেগুলো নিয়ে এই শিবিরের দেশ এবং দলগুলি একইসাথে কাজ করবে। আমরা সংগঠনের কাজের জন্য নির্দিস্ট কিছু রুপরেখা তৈরি করেছি ।কিন্তু সত্য হল যেকোনভাবেই এগুলো আনুষ্ঠানিক হয়ে গেছে । এগুলো দিয়ে ভাল্ভাবে যৌথভাবে কাজ করা যায় না যেমন ওয়ার্স চুক্তি এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার সংগঠনসমূহ। বিষয়টি একটু পরিষ্কার করি। আমাদের সাথেও পরামর্শ করতে হবে প্রশ্নটা তা নয়। আমাদের সাথে পরামর্শ করা দরকার এটা অবশ্যই কেউ অস্বীকার করবে না কিন্তু পরামর্শের জন্য সভা করা দরকার।  সমস্যাটাকে আমরা নীতিগত মনে করে তুলে ধরেছি এবং বলছি যে সংগঠনসমূহকে নিয়মিত বিরতিতে কাজ করতে হবে। সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে এবং গৃহিত সিদ্ধান্ত ঠিকমত কার্যকর হচ্ছে কিনা তা যাচাই করতে হবে। সমাজতান্ত্রিক শিবিরের দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি এবং অধিকতর শক্তি অর্জনই আমাদের দল এবং সরকারের দেখার বিষয় এবং এগুলো এই শিবিরের অজেয় শক্তির  চুড়ান্ত পরিস্থিতি তৈরি করবে।

সমাজতন্ত্র এবং সাম্যবাদী বিনির্মান আমাদের দেশে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। এটা সম্ভব হচ্ছে দেশের মানুষের বিড়াট প্রচেষ্টার কারনে এবং একে অপরকে সহযোগিতার কারনে। এক্ষেত্রে   সমাজতান্ত্রিক দেশের সমন্বিত পরিকল্পনা এবং পারস্পরিক অর্থনৈতিক সহযোগিতার সংগঠনের পরিকল্পনা ও নির্দেশনা বড় ভুমিকা পালন করছে।

এতটা আলবেনিয়া কোন দেশকে অর্থনৈতিক  সহযোগিতা করে নি কারন প্রথমত আমরা গরীব দ্বিতীয়ত আমাদের প্রয়োজনে কোন দেশ অর্থনৈতিক সাহায্য নিয়ে আমাদের পাশে দাঁড়ায়  না।কিন্তু তারপরেও সঠিক রীতি মেনে বন্ধুসম ভ্রাতাসম দেশগুলোকে রপ্তানির মাধ্যমে যতটুকু সহযোগিতা করা যায় তা করার চেষ্টা করছি। আমাদের বন্ধু সোভিয়েত ইউনিয়নই আমাদের প্রথম সহযোগিতা করেছিল।  অর্থ ও বিশেষজ্ঞ দিয়ে আমাদের সাহায্য করেছিল যা ছাড়া আজকে যতটা উন্নতি করেছি তা অর্জনে খুব কষ্ট হত।

সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং অন্যান্য গনতান্ত্রিক দেশ আমাদের জনগনের জন্য সর্বোচ্চ যে উদার সহযোগিতা করেছে আমরা তার সর্বোচ্চ ব্যাবহার করেছি। আমাদের দেশ চিরদিন সোভিয়েত জনতা, সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি ও সরকারের প্রতি এবং অন্যান্য গনতান্ত্রিক দেশের জনতা এবং সরকারের প্রতি তাদের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞ থাকব। আমরা এই সহযোগিতাকে ভাতৃত্বমূলক আন্তর্জাতিক সহযোগিতা হিসাবে মনে করতাম এখন মনে করি এবং ভবিষ্যতেও মনে করব কখন দান হিসাবে নয়। আমাদের জনতা ভীষণ দারিদ্র্যের মধ্যে থেকে লড়াই করে জীবন দিয়েছে পুড়ে মরেছে তখন অপেক্ষাকৃত স্বচ্ছল বন্ধু ভাইদের কাছে সাহায্যের আবেদন করা দায়িত্ব মনে করেছে। এখনও বন্ধুদের সাহায্য করা আন্তর্জাতিক দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। তাই, যারা সাহায্যের উদ্দেশ্য এবং স্বরুপ সমন্ধে ক্ষতিকর এবং মার্ক্সবাদ বিরোধী মতামত ধারন করেন তাদের প্রত্যাখ্যান করা জরুরি। আলবেনিয়ার পার্টি, সরকার এবং জনতার উপর অর্থনৈতিক চাপ কোনদিন কোন কাজে আসবে না।

আমি এখানে প্রস্তাব করতে চাই অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশের দুর্বল দেশগুলিকে যার মধ্যে আমরাও পড়ি তাদের অধিকতর সহযোগিতা করা উচিৎ । হাত গুটিয়ে থেকে অন্যের মুখাপেক্ষি থাকার অভিসন্ধি আলবেনিয়ার জনতা কোনভাবেই পোষন করে না। এটা তাদের অভ্যেস না। অন্যান্য জনগনতান্ত্রিক দেশের জীবনমান আমরা রাতারাতি অর্জন করে ফেলব তা আশা করি না,  কিন্তু আমাদের উৎপাদন  শক্তির বিকাশে সহযোগিতা পাব বলে আসা করি। আমরা এও মনে করি সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী দেশসমূহের নিরপেক্ষ পুঁজিবাদী দেশ এবং উপনিবেশ থেকে সদ্য স্বাধীন দেশগুলিকে আর্থিকভাবে সাহায্য করা উচিৎ সেক্ষেত্রে খেয়াল রাখতে হবে এই দেশগুলোর নেতারা সাম্রাজ্যবাদের বিরোধী কিনা, সমাজতান্ত্রিক শিবিরের শান্তি নীতিকে সমর্থন করে কিনা এবং সেই সমস্ত দেশে ন্যায্য বিপ্লবী আন্দোলনকে চলতে দেয় কিনা। তবে এক্ষেত্রে প্রথম  সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর চাহিদাকে মেটানোর দিকটাকে যত্নসহকারে দেখতে হবে।  অবশ্যই ভারতের লোহা এবং স্টিলের প্রয়োজন আছে কিন্তু তার চেয়ে সমাজতান্ত্রিক  আলবেনিয়ার প্রয়োজন আর বেশি।  মিশর বিদ্যুত এবং সেচের সংকটে আছে কিন্তু তার চেয়ে সমাজতান্ত্রিক আলবেনিয়া গুরুতর সংকটে আছে। 

গুরুত্ত্বের বিবেচনায় প্রথম এরকম অনেক রাজনৈতিক বিষয়ে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের দেশসমূহের অভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আছে। কিন্তু যেহেতু যৌথ পরামর্শের নিয়মিত অভ্যাস গড়ে উঠেনি, তাই নানান বিষয়কে কেন্দ্র করে অনেক দেশকে রাজনৈতিক ভুমিকা নিতে দেখা গেছে। রাজনৈতিক ভুমিকা রাখাটা যে নীতি বিরুদ্ধ তা বলছি না কিন্তু তাদের এই ভুমিকার জন্য অনেক সময় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এগুলির মধ্যে অনেকগুলি সঠিকও না কারন সেগুলো ওয়ার্স চুক্তির  অন্তর্ভুক্ত সদস্যদের যৌথভাবে সিদ্ধান্ত নেয়া উচিৎ ।

এরকম একটা ভুমিকা হল বুলগেরিয়ার সরকার গ্রিক সরকারকে জানিয়েছে যে যদি গ্রীস নিরস্ত্রীকরণে রাজি হয় তাহলে বলকান অঞ্চলের অন্যান্য গনতান্ত্রিক দেশগুলো তা করবে যা আলবেনিয়ার জন্য পুরোটাই একটা অবজ্ঞা। আমরা মনে করি এই জাতের তৎপরতা ভ্রান্তিকর। এমনকি গ্রীস যদি রাজিও হয় আলবেনিয়া তা গ্রহন করবে না। ১৯৫৯ সালের মে মাসে নিকিতা ক্রুশ্চেভের সোভিয়েত প্রস্তাবের সাথে আমরা চুক্তিবদ্ধ কিন্তু ইতালিকে অক্ষত রেখে বলকান অঞ্চলকে নিরস্ত্রীকরণের বুলগেরিয়ার  প্রস্তাবের সাথে আমাদের কোন সমঝোতা নেই। অথবা বুলগেরিয়ার কমরেডরা কি ভুলে গেছে এই শতাব্দির অনেক সময়ে ইতালির বুর্জোয়া এবং ফ্যাসিস্টরা আলবেনিয়াকে আক্রমণ করেছিল?

যখন গ্রীস সরকার আলবেনিয়ার সাথে যুদ্ধাবস্থায় আছে এবং আমাদের সীমানা দাবী করছে তখন কি আলবেনিয়ার সাথে যে প্রতিরক্ষা চুক্তির কারনে  বুলগেরিয়া আমাদের  সাথে আলোচনা করতে  বাধ্য তা না করে গ্রীসকে অনাগ্রাসন প্রস্তাব দিতে পারে?   আমাদের কাছে মনে হয়েছে এভাবে এককভাবে কাজ করা বিপদজ্জনক। আমাদের এই সঠিক ও আইনসংগত অবস্থানের কারনে হয়ত বুলগেরিয়ার কমরেডরা ভাবতে পারেন আমরা সহাবস্থান ভাল বুঝি না আমরা যুদ্ধ চাই। এরকম ধারনা ভ্রান্ত।

পলিস কমরেডদের একই অবস্থান দেখেছি জাতিসংঘে। কমরেড গমুলকো যখন জাতিসংঘের সাধারন অধিবেশনে ভাষণ দেন তিনি গোটা পৃথিবীতে দৃঢ়ভাবে সামরিক উপস্থিতির প্রস্তাব করেন। তিনি প্রতাব রাখেন নতুন করে কেউ সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করতে পারবে না, যারা পুর্বে নির্মান করেছে তাদেরগুলো থাকবে, নতুন করে কেউ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করতে পারবে না যাদের আগে থেকে আছে সেগুলো শুধু থাকা উচিৎ , যাদের আগে থেকে গোপন পারমানবিক বিস্ফোরক আছে তারা অন্যদের কাছে হস্তান্তর করতে পারবে না । আমাদের মতে এ জাতের প্রস্তাব আমাদের শিবেরর স্বার্থের পরিপন্থী। কোন ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করা যাবে না কিন্তু কারা কোথায় স্থাপন করা যাবে না? ইতালি, পশ্চিম জার্মানি, গ্রীসসহ ন্যাটোভুক্ত সকল সদস্য ক্ষেপণাস্ত্রে সজ্জিত। গোপন আনবিক বোমা কার কাছে দয়া চলবে না কিন্তু কাদের কাছে? ব্রিটেন, ফ্রান্স পশ্চিম জার্মানির তা আছে। এই প্রস্তাবের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট যে সোভিয়েত ইউনিয়ন ছাড়া কোন গণতান্ত্রিক দেশ বা সমাজতান্ত্রিক শিবিরের কোন দেশ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপন করতে এবং পারমানবিক বোমার অধিকারী হতে পারবে না।

সমাজতান্ত্রিক চীনের কেন পারমানবিক অস্ত্র থাকবে না এই প্রশ্নটা আমরা উত্থাপন করতে চাই? আমরা মনে করি চীনের হাতে বোমা এবং ক্ষেপণাস্ত্র থাকলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কি ভাষায় কথা বলে , আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের অধিকারকে মার্কিন অস্বীকার করতে থাকে কিনা। আমরা দেখতে পাব মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ তাদের অস্ত্রের হুমকি দেয় কিনা যা এখন দিয়ে চলছে।

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন যে বোমার মালিক হয়ে তা আমেরিকার উপর ফেলে কি চীন তাদের অধিকার আদায় করতে পারবে? যাদের রক্তে আগ্রাসন যুদ্ধ তারা আক্রমণ না করলে চীন বা সোভিয়েত ইউনিয়ন কেউ তাদের দখলে থাকা অস্ত্র ব্যাবহার করবে না। সোভিয়তের হাতে বোম না থাকলে সাম্রাজ্যবাদীরা আমাদের সাথে অন্য ভাষায় কথা বলত। আমরা কখনই বোমার আক্রমণ করতে যাব না, আমরা যুদ্ধ চাই না, আমরা সকল বোমা ধ্বংস করতে রাজি আছি কিন্তু রাখছি শুধু প্রতিরক্ষার স্বার্থে। আমাদের দেশে একটা প্রবাদ আছে যে ভয়ের কারনে দ্রাক্ষাবনে পাহারা বসে। সাম্রাজ্যবাদীদের ভয়ের মধ্যে রাখা উচিৎ ।

মার্ক্সবাদ লেনিনবাদকে ভিত্তি করে শান্তির  লক্ষ্যে মস্কো ঘোষণা ( Declaration) এবং বিবৃতি( Statement)কে ভিত্তি করে আন্তর্জাতিক পলিসি নির্ধারনে এবং সমাজতান্ত্রিক বিনির্মানে  গুরুত্বপুর্ন সমস্যা সমাধানে আলবেনিয়ার লেবার পার্টি সঠিক মার্ক্সবাদী লেনবাদি লাইন গ্রহণ করেছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সাথে আমাদের পার্টি লাইনের সংগতি আছে। এবং সোভিয়েত শান্তির নীতিকে আমরা অনুসরন করেছি।

সোভিয়েত ইউনিয়নকে আমরা আমাদের জনগনের রক্ষাকারী,এর সার্বজনীন অভিজ্ঞতা সকলের জন্য  ভীষণ জরুরি এবং অবিচ্ছেদ্য  বলে মনে করতাম এখন করি এবং ভবিষ্যতেও মনে করব। আলবেনিয়ার লেবার পার্টি তাদের অভিজ্ঞতাকে অনুসরণ করে ,প্রয়োগ করে গ্রহণ করে সফল হয়েছে। আমরা শিল্প প্রতিষ্ঠায় এবং একে শক্তিশালী করতে সফল হয়েছি, কৃষি, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সফলতা অর্জন করেছি আর এগুলো আমাদের রাষ্ট্র এবং পার্টিকে বিড়াট অগ্রগতি এনে দিয়েছে। এই ক্ষেত্রে আমাদের দল পরিপক্ক উন্নত অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। 

আমাদের পার্টি আমাদের জনতাকে এই শিক্ষায় দেয় যে তারা সোভিয়েত জনগন এবং তাদের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি ভালবাসা ও বিশ্বস্ততা দেখাবে। মার্ক্সবাদ লেনিনবাদ এবং সর্বহারার আন্তর্জাতিকতাকে পুঁজি করে তারা প্রয়োজনে রক্ত দিয়ে এই ভালবাসার স্বরুপ দেখাবে। আমরা যেমন সোভিয়েত ইউনিয়নকে গভীর ভালবাসি তেমনি সোভিয়ে ইউনিয়ন আমাদের দল এবং জনতাকে ভালবাসে। এটাই জনতার বন্ধুত্ব মার্ক্সবাদি লেনিনবাদি পার্টিসমূহের বন্ধুত্ব। সময়ের ব্যাবধানে গাড় হয় মরে যায় না। এটাই আলবেনিয়ার কমিউনিস্টদের অটল বিশ্বাস এবং তাদের জনতার মধ্যে এই বীজই তারা বুনে গেছে বুনে যাবে। আমরা আগেও বলেছি আবার বলছি যে এই বন্ধুত্ব না থাকলে মারা স্বাধীন নাও হতে পারতাম। এটি লেনিনবাদেরই ফল।

আলবেনিয়ার লেবার পার্টি এবং জনতা বিড়াট সমস্যার আবর্তে। ভৌগলিকভাবে পুঁজিবাদি দেশ এবং যোগস্লাভ সংসোধনবাদ আমাদের ঘিরে ফেলেছে। সাম্রাজ্যবাদ ও তাদের দোসর ও চামচাদের অপরিমেয় চেষ্টাকে প্রতিরোধ করে আমাদের সীমানা , স্বাধীনতা সার্ভমৌত্ত রক্ষায় অতন্দ্র প্রহরা দরকার, দরকার পরিমানমত অর্থ।

আমাদের ছোট্র দেশের সীমিত জনতা অনেক কষ্ট পেয়েছে কিন্তু বিড়াট কঠিন সংগ্রাম করেছে। আমাদের নিজেদের রক্তে যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি এবং ভোগ করছি তার জন্য আমরা কারো কাছে ঋণী নয়। সমাজতান্ত্রিক শিবির বিশেষত আলবেনিয়ার বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদী শত্রু এবং তাদের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আমরা সদা দিবারাত্র জাগ্রত। আর এই কারনেই তাদের চরিত্র পরিবর্তন নিয়ে আমাদের কোনদিন কোন  মোহ জন্ম নেয় নি। সোভিয়ে্ত ইউনিয়ন, চীন সমাজতান্ত্রিক শিবিরের অন্যান্য দেশ এবং বিশ্বের প্রগতিশীল জনতার পাশে থেকে শান্তির জন্য আমাদের পার্টি বিরামহীন লড়াই চালিয়ে যাবে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের শান্তির নীতিকে শক্তিশালী করার জন্য আমরা আমাদের সর্বোচ্চ সামর্থ্য দিয়ে একে সমর্থন দিয়েছি। প্রত্যেকটা বিষয়ে প্রস্তাবে আমরা সংহতি জানিয়েছি।

ইঙ্গ মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ আলবেনিয়াকে বর্বর ও যুদ্ধপ্রিয় বলে অভিযুক্ত করেছে। আলবেনিয়ার জনতা এটা বুঝে । যেহেতু পৌনঃপনিক শৃংখল প্রচেষ্টাকে আমরা ব্যর্থ করেছি, যেহেতু আলবেনয়ার পার্টি এবং রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সকল ষড়যন্ত্রকে আমরা নস্যাত করেছি এগুলি তারই জের। আলবেনিয়ার জনতাকে অধিনস্থ করার মতলবকে কোন বিবেচনার ধার না ধরে যখন আক্রমণ করেছি তখন  টিটো গোষ্ঠী , উগ্র জাত্যাভিমানী( chauvinists)  সামন্ত-ফ্যাসিবাদি( monarcho-fascist) গ্রীস ,রোমের শাসককূল আমাদের যুদ্ধবাজ এবং বলকান অঞ্চলে শান্তির উপদ্রপকারি হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। সমাজতান্ত্রিক  দেশ এবং মার্ক্সবাদি লেনিনবাদি পার্টির জন্য যুদ্ধ যে  অপরিচিত কোন বিষয় নয় আমরা মনে করিনা যে আমাদের তা প্রমান করতে হবে । কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় কেন সাম্রাজ্যবাদী এবং তার দালালেরা চীন ও আলবেনিয়াকে যুদ্ধপ্রিয় বলে অভিযুক্ত করে, অভিযুক্ত করে শান্তিপুর্ন সহাবস্থানের বিরোধিতাকারী হিসাবে?

আলবেনিয়াকে উদাহরণ হিসাবে নেয়া যাক। কার বিরুদ্ধে এবং কেন আলবেনিয়া যুদ্ধে লিপ্ত হবে? এই প্রশ্নের উত্তরে সময় নষ্ট করা হাস্যকর। কিন্তু যারা আলবেনিয়ার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনছে তারা তাদের আগ্রাসী মনোভাবকে  ঢাকবার জন্যই করছে।

র‍্যাঙ্কোভিস( Rankovich) আমদের সীমান্তকে দুই দরজাবিশিষ্ট রোডহাউস বানাতে চেয়েছিল যার মধ্য দিয়ে যুগোস্লাভিয়া, ইতালি এবং গ্রীসের অস্ত্র যেন বিনা ভিসায় অনায়াসে আনানেয়া করা যায় । যাতে করে তাদের গলাকাটা সংস্কৃতি আমাদের উপর চাপাতে পারে , আলবেনিয়াকে যুগোস্লাভিয়ার সপ্তম রাজ্য হিসাবে টিটো গন্য করতে পারে। ইতালির প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া যাতে তৃতীয়বারের মত আলবেনিয়ায় তাদের লুন্ঠন চালাতে পারে। যাতে করে গ্রীস সামন্তীয় ফ্যাসিবাদীরা মনে করতে পারে যে দক্ষিন আলবেনিয়াকে তারা দখল করতে পেরেছে। যেহেতু আমরা এসব সহ্য করছি না সহ্য করবনা , তাই আমরা যুদ্ধবাজ। তারা ভালভাবেই জানে যে তারা আমাদের সীমানা লঙ্ঘন করলে আমাদের বিরুদ্ধে এবং সমাজতান্ত্রিক শিবিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই তা করতে হবে।

এইকারনেই তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে আমাদেরকে সমাজতান্ত্রিক শিবির এবং আমাদের বন্দধুদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা যুদ্ধবাজ এবং বর্বর হিসাবে আখ্যা দিয়ে। যেহেতু আমাদের সীমানা তাদের চারণভুমির মত ব্যাবহার করতে দিইনি তাই তারা অভিযোগ করেছে আমরা শান্তিপুর্ন সহাবস্থানের বিরোধী। কিন্তু নির্মম পরিহাসের ব্যাপার হচ্ছে যে এমন কমরেড আছেন যারা আলবেনিয়ার বিরুদ্ধে এই শোধনবাদী খেলা এবং কুৎসাকে বাহবা দিচ্ছে। অবশ্যই আমরা সেই ধরনের সহাবস্থানের বিরুদ্ধে যার জন্য সফোক্লিস ভেনিজোলস এর কাছে ভুখন্ডগত এবং রাজনৈতিকভাবে ছাড় দিতে হয়। না, আলবেনিয়ার ভুখন্ড বিনিময়ের মাধ্যম হওয়ার দিন চিরদিনের জন্য ফুরিয়ে গেছে। যুগোস্লাভিয়ার সংশোধনবাদী, সাম্রাজ্যবাদের দালাল, মার্ক্সবাদ লেনিনবাদের বিশ্বাসঘাতকদের           বিরুদ্ধে সংগ্রাম ছেড়ে দেওয়ার শর্তে তাদের সাথে আমাদের সহাবস্থান হতে পারে না।  রাজা জগের সময়ে যে ধরনের রাজনৈতিক, কুটনৈতিক এবং ব্যাবসা-বানিজ্যের ক্ষেত্রে ব্রিটিস এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে  ছাড় দিত একই জিনিস যদি  সহাবস্থানের নামে  আমাদের স্বীকৃতি দিতে হয় তাহলে সে ধরনের সহাবস্থানের আমরা বিরোধীতা করি।

আলবেনিয়ার লেবার পার্টি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে যে আমাদের মহৎ উদ্দেশ্য, সমাজতন্ত্র ও শান্তি বিজয়ী হবে। সংকল্প অনুসারে কাজ ,সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে সমাজতান্ত্রিক শিবিরের ঐক্যবদ্ধ শক্তি, আন্তর্জাতিক সাম্যবাদী  ও শ্রমিক আন্দোলন এবং বিশ্বের শান্তিপ্রিয় মানুষ এর সবগুলো সাম্রাজ্যবাদকে শান্তিপুর্ন সহাবস্থান গ্রহণ করতে এবং যুদ্ধ এড়াতে বাধ্য করবে।

প্রিয় কমরেডস,

শান্তি,গনতন্ত্র, জাতীয় স্বাধিনতা এবং সমাজতন্ত্রের বিজয়ের নির্ধারক হচ্ছে  বিশ্ব সাম্যবাদি ও শ্রমিক আন্দোলনের ঐক্য। ১৯৫৭ সালের মস্কো ঘোষণা এবং এই সভার জন্য প্রস্তুতকৃত খসড়া বিবৃতিতে এই প্রশ্নের উপর বিশেষ জোর দেয়া হয়েছে। বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যাবস্থা এবং সাম্যবাদি আন্দোলনের জন্য যে কমিনিস্ট ও ওয়ার্কাস পার্টির বিশেষ ঐতিহাসিক দায়িত্ব আছে তার উপর ১৯৫৭ সালের মস্কো ঘোষণায় জোর দেয়া হয়েছিল। সভায় উপস্থিত কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কাস পার্টি ঘোষণা করছে যে তারা কোন সময় নষ্ট না করে ঐক্যকে সুদৃঢ় করবে। সমাজতান্ত্রিক পরিবারের ঐক্যের স্বার্থে, আন্তর্জাতিক সাম্যবাদি ও শ্রমিক   আন্দোলনের স্বার্থে ,শান্তি ও সমাজতন্ত্রের স্বার্থে পরস্পরের মধ্যে কমরেডসুলভ সহযোগিতা চালিয়ে যাবে। এটা অবশ্যই বলা যাবে যে বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে আন্তর্জাতিক সাম্যবাদি আন্দোলনে এবং কতিপয় পার্টির মধ্যে গুরুতর আদর্শগত এবং রাজনৈতিক সমস্যা দেখা দিয়েছে যার নিস্পত্তি ছাড়া আমাদের মহৎ উদ্দেশ্যের জন্য বিড়াট ক্ষতি ডেকে আনতে পারে। তাই আলবেনিয়ার পার্টি মনে করে সামনে এগিয়ে গিয়ে বিজয় সূচিত করতে হলে এখন পর্যন্ত যে ভুল হয়েছে এবং নেতিবাচক প্রকাশ পেয়েছে তা শুধরে নেয়া জরুরি। 

আমরা বুখারেষ্ট মিটিঙের কথা উল্লেখ করতে চাই। আপনারা সকলে জানেন যে সেই সময় সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি এবং চীনের কমিনিস্ট পার্টির মধ্যে যে মতানৈক্য ছিল সে সমন্ধে আমরা মতামত রাখতে বিরত থেকেছি। কিন্তু কমিউনিস্ট ও অয়ার্কাস পার্টির প্রতিনিধিদের এই সভায় সেই মতামত ব্যক্ত করার অধিকার আমাদের আছে। সে সময়ে আলবেনিয়ার লেবার পার্টি সোভিয়েত কমরেড এবং অন্যান্য পার্টির কমরেড কতৃক অভিযুক্ত হয়েছিল যার সবকিছুই কল্পনাযোগ্য। কিন্তু কেউ একবারের জন্য ভাববার  চেষ্টা  করলনা কেন সেই পার্টি সকল চিন্তার বিরুদ্ধে অবস্থান নিল, যারা শেষ পর্যন্ত মার্ক্সবাদ লেনিনবাদ এবং মস্কো ঘোষনার প্রতি বিস্বস্ত ছিল তারা অপ্রত্যাসিতভাবে আজ এর বিরুদ্ধ বলে অভিযুক্ত , যারা সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং সোভিয়েত পার্টির এত কাছাকাছি ছিল আজ তারা সোভিয়েত নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নিল।

এখন চীন এবং সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি উভয়ের বক্তব্যই কমরেডদের হাতে। উভয় মতামত পড়েছি, পার্টির কর্মিদের সাথে যত্নসহকারে আলোচনা করে সর্বসম্মত মতামত নিয়ে এই সভায় হাজির হয়েছি।

এই বছরের জুনের ২৪ তারিখে সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতাদের পরামর্শে আকস্মিকভাবে রোমানিয়ার লেবার পার্টি বুখারেস্ট কনফারেন্সের আয়োজন করে। জুনের ২ ও ৭ তারিখের চিঠির মাধ্যমে আজকের যে কনফারেন্স হচ্ছে তা নিয়ে মতবিনিময় না করে সম্পুর্ন আলাদা বিষয়বস্তু হাজির করা হয়। সেটা মূলত সোভিয়েত তথ্যাদির ভিত্তিতে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির উপর আদর্শিক ও রাজনৈতিক আক্রমণ পরিচালনা। বিভিন্ন দেশের ভাতৃপ্রতিম কমিউনিস্ট  ও ওয়ার্কাস পার্টির প্রতিনিধিরা যেখানে মিটিং শুরুর কয়েক ঘন্টা আগেও কিছু জানত না তারা সেখানে সোভিয়েত পার্টির তথ্যের ভিত্তিতে তাদের পক্ষে অবস্থান নেয়। সময়টা ছিল এমন যখন প্রতিনিধিরা অন্য উদ্দেশ্যে বুখারেস্টে এসেছিলেন এবং তাদের স্ব স্ব পার্টির পক্ষে থেকে এরকম আন্তর্জাতিক সাম্যবাদি গুরুত্বপুর্ন  বিষয়ে  আলোচনা করার এখতিয়ার দেওয়া হয়নি সিদ্ধান্ত দেয়াত দুরের কথা।  উপস্থিত প্রিতিনিধিদের সমস্ত দিক থেকে বিচার করে মতামত রাখার মত প্রয়োজনীয় সময় অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে দেয়া হয়নি , অপর একটা মার্ক্সবাদি লেনিনবাদি পার্টির বিরুদ্ধে এমন গুরুতর অভিযোগের বিরুদ্ধে তারা গভীরভাবে ভাববার কথা চিন্তা করতে পারে নি।  ঘটনা হল  সোভিয়েত নেতৃত্ব যেভাবেই হোক  চীনের বিরুদ্ধে একটা সিদ্ধান্ত চায় এবং চিন যাতে দ্রুত যেকোন মূল্যে তার সমালোচনা করে।  সকল আন্তর্জাতিক  পরিস্থিতি যেগুলো সমাজতান্ত্রিক শিবির সহ গোটা বিশ্বের জন্য উদ্বিগ্নের কারন সেগুলো কমরেড ক্রুশ্চেভ এবং সোভিয়েত কমরেডদের চিন্তার বিষয় নয় বরং এইটাই তাদের বিষয়।

আমাদের পার্টি এই জাতের কনফারেন্সের যেটা এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে তার  সাথে সম্পুর্ন একমত , সেক্ষেত্রে যেধরনেরই এজেন্ডা অন্তর্ভুক্ত করা হোক না কেন যদি সকল পার্টির অনুমোদন থাকে, পুর্বেই এজেন্ডার বিষয় জানানো হয়, যদি কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কাস পার্টিগুলোকে প্রয়োজনীয় রসদ সরবরাহ করে পড়ার মত যথেষ্ট সময় দেয়া হয় যাতে করে তারা প্রস্তুতি নিতে পারে , পলিট ব্যুরোর অনুমোদন লাভ করতে পারে, প্রয়োজন হলে কেন্দ্রীয় কমিটির প্লেনামে কনফারেন্সের সম্ভাব্য সিদ্ধান্তে আলোচনা করতে পারে। কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কাস পার্টির সাথে লেনিনীয় সম্পর্কের রীতিতে কনফারেন্স পরিচালিত করা দরকার। পার্টিসমূহের মধ্যে পরিপুর্ন সমতা, কমরেডসুলভ, কমিউনিস্ট ও আন্তর্জাতিক চেতনায় এবং কমিউনিস্ট মূল্যবোধের ভিত্তিতে কনফারেন্স পরিচালিত হওয়া উচিৎ। বুখারেস্ট কনফারেন্স এই রীতির ভিত্তিতে পরিচালিত হয় নি। তাই আমরা অংশগ্রহন করলেও এর বিরোধীতা করেছি ,এখন করছি ।

বুখারেস্ট কনফারেন্স এই রীতি মেনে হয়নি। যদিও আমাদের পার্টি তাতে অংশগ্রহণ করেছে তথাপি আমরা একে প্রত্যাখ্যান করছি, বিশৃঙ্খল বলে অভিযোগ করছি, মার্ক্সবাদি-লেনিনবাদি রীতির লঙ্ঘন বলে মনে করি।

আমরা বুখারেস্ট কনফারেন্সকে আন্তর্জাতিক সাম্যবাদি আন্দোলনের জন্য বিড়াট ক্ষতি মনে করি, ক্ষতি মনে করি আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতি প্রশ্নে, সমাজতান্ত্রিক শিবিরের ঐক্যকে শক্তিশালী করার প্রশ্নে, যে সমস্ত আদর্শিক,রাজনৈতিক সাংগঠনিক বিতর্কগুলি কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কাস পার্টির নেতাকর্মিদের মধ্যে তৈরি হওয়ার কারনে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদকে ক্ষতিগ্রস্ত করে সে সমস্ত ক্ষেত্রে   বিরোধ মিমাংসার মার্ক্সবাদি-লেনিনবাদি নজির স্থাপনের প্রশ্নে ক্ষতি সাধন করেছে। এর দায় সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃস্থানীয়(leadership) কমরেডদের উপর বর্তায়। কেননা তারা এই কনফারেন্সের আয়োযোগ এবং অমার্ক্সিয় রীতি প্রয়োগকারী।

উদ্দেশ্য ছিল -আন্তর্জাতিকভাবে চীন তাদের ভুলের জন্য সমালোচিত হোক অথচ যে ভুল তারা করেনি এবং যা ভিত্তিহীন। চীন ও সোভিয়েত ইউনিয়ন উভয়ের দলিল দস্তাবেস পড়ে ,আন্তর্জাতিক অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে উভয়ের অফিসিয়াল অবস্থানকে পরিপুর্নভাবে বিশ্লেষণ করে আলবেনিয়ার লেবার পার্টির কেন্দ্রিয় কমিটি পুরোমাত্রায় সন্দেহাতীত।

চীনের পার্টি মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ থেকে বিচ্যুত হয়েছে, ১৯৫৭ সালের মস্কো ঘোষণা লঙ্ঘন করেছে জাতীয় বুখারেস্ট কনফারেন্সে করা  সোভিয়েত পার্টির অন্যায় অভিযোগ সম্পর্কে আলবেনিয়ার লেবার পার্টি সর্বোসম্মতভাবে মনে করে যে সোভিয়েত পার্টি এক বিড়াট ভুল করেছে। তারা চীনের পার্টিকে গোঁড়া ( dogmatic), উপদলপ্রবণ( sectarian), যুদ্ধের পক্ষে অবস্থানকারী,শান্তিপুর্ন সহাবস্থানের বিরোধিতাকারী, আন্তর্জাতিক সাম্যবাদি শিবিরে বিশেষ অধিকার প্রত্যাশী ইত্যাদি অভিযোগে অভিযুক্ত করে।

সোভিয়েত কমরেডরা আরো একটা বড় ভুল করেছে। সেটা হল গোটা দুনিয়ার কমিউনিস্টদের সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং তাদের পার্টির উপর যে ভালবাসা ও বিশ্বাস আছে তাকে ব্যবহার করে তাদের ভ্রান্ত চিন্তাকে চীনের কমিউনিস্ট পার্টিসহ অনযদের উপর চাপাতে চেয়েছেন।

শুরু  থেকেই যখন সোভিয়েত কমরেডরা আমাদের বুখারেস্টে পাঠানো প্রতিনিধিদের উপর চাতুরি করে কিছু চাপানর জন্য উত্তেজিত ও অনুমোদনযোগ্য কর্মকান্ড শুরু করেছিল আলবেনিয়ার লেবার পার্টির কাছে পরিস্কার হয়ে গিয়েছিল যে সোভিয়েত কমরেডরা তাদের ভিত্তিহীন যুক্তি আর চাপের মাধ্যমে আমাদের প্রতিনিধিকে তাদের বিকৃত লাইন গ্রহণ করার জন্য ফাঁদে ফেলতে চায়।

আমরা সোভিয়েত লাইন গ্রহণ করব কিনা সেটাই কমরেড ক্রুশ্চেভ  কাছে এবং কমরেড অন্ত্রপভ কমরেড হাইস্নি কাপোকে যা বলেছিল তা গুরুত্বপুর্ন ছিল। বুখারেস্ট সভায় আমাদের আমাদের দলের বিরুদ্ধে মন্তব্য ছুড়ে দিয়ে কমরেড ক্রুশ্চেভ তার অভিব্যাক্তি ব্যাক্ত করেছিলেন। বুখারেস্ট মিটিঙয়ের পরে সোভিয়েত নেতৃত্ব ও তিরানায় অবস্থিত সোভিয়েত দূতাবাসের কর্মচারীদের অন্যায় এবং অবন্ধুত্বসূলভ আচরন দ্বারা কমরেড ক্রুশ্চেভের অভিব্যাক্তি সমর্থিত হয়েছিল যে বিষয় নিয়ে আমি পরে আলোচনা করব। মার্ক্সবাদি-লেনিনবাদি পার্টি হিসাবে কি দৃষ্টিভঙ্গি রাখা উচিত তা সোভিয়েত নেতৃত্বের কাছে গুরুত্বপুর্ন ছিল না গুরুত্বপুর্ন ছিল আমরা তাদের লাইন গ্রহন করছি কি না। সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি বুখারেস্টে যে সভার আয়োজন করেছিল সেখানে রুমানিয়ার লেবার পার্টির কংগ্রেস উপলক্ষে চিনের পার্টির বিরুদ্ধে গুরুতর ভুল লাইন গ্রহন করা নিয়ে যে অভিযোগ করা হবে সে সম্পর্কে আগে থেকে আমাদের কোন কিছু জানানো হয়নি। এটা সম্পুর্নভাবে আমাদের কাছে  ছিল একটা বিস্ময় ।এখন আমরা শুনি যে আলবেনিয়ার লেবার পার্টি ছাড়া চিনের কমিউনিস্ট পার্টি, কোরিয়ার লেবার পার্টি, ভিয়েতনামের ওয়ার্কাস পার্টি এবং শিবিরের অন্যান্য দল বুখারেস্টে চিনকে যে অভিযুক্ত করা হবে তারা  তা জানতেন। এরকম হয়ে থাকলে এটা অত্যন্ত পরিস্কার যে প্রশ্নটি ভীষণ গুরুতর এবং আন্তর্জাতিক দলাদলির একটা কাঠামো অনুমান করা যায় ।

তা সত্ত্বে আমাদের পার্টির সতর্কতার ঘাটতি ছিল না। আর এটা সম্ভব হয়েছে এই কারনে যে আমরা সর্বদা  অন্যান্য দলের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে লেনিনীয় রীতিকে খেয়াল করে এসেছি, সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টি, চিনের পার্টি সহ অন্যান্য সকল কমিউনিস্ট ও ওয়ার্কাস পার্টির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা পোষণ করে এসেছি। আমাদের দল সকল দলের  মধ্যে সমতার  অনুভূতিকে শ্রদ্ধা করে এবং আলবেনিয়ার দল যত ছোট হোক না কেন অন্যানয দলের কাছে একই শ্রদ্ধা আশা করে ।

বুখারেস্ট সভার শুরু থেকে আমাদের পার্টি লক্ষ্য করেছে এই রীতি লঙ্ঘণের ঘটনা তাই আমরা একটা অবস্থান নিয়েছি যেটাকে আমরা একমাত্র সঠিক মনে করতাম এবং সঠিক মনে করি । ভাতৃত্বপুর্ন দলের কিছু নেতৃত্ব আমাদেরকে নিরেপক্ষ বলে অভিহিত করেছেন এবং কেউ কেউ আমাদের অভিযুক্ত করেছেন যে আমরা সঠিক মার্ক্সবাদি লেনিনবাদি লাইন থেকে বিচ্যুত হয়েছি এবং এই নেতারা আর অনেক অগ্রসর হয়ে তাদের দলের সামনে আমাদের কালিমালিপ্ত করার চেষ্টা করেছে। আমরা ঘৃণার সাথে সকল অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি কারন, এগুলি কুৎসা ,তারা সততার পরিচয় দেন নি এবং এগুলি কমিউনিস্ট নৈতিকতার বিরোধী।

নারী দিবস -আলেক্সান্দ্রা কলনটাই

নারী দিবস কি?  সত্যি কি এর দরকার আছে? এটা কি পুঁজিপতি শ্রেনীর   নারীদের কাছে, নারীবাদীদের এবং  নারীর ভোটাধিকারের জন্য আন্দোলনকারীদের কাছে ছাড় দেয়া   নয়? এটা কি শ্রমিক আন্দোলনের ঐক্যের জন্য ক্ষতিকর নয়?

বিদেশে শোনা না গেলেও এখনও রাশিয়াতে এই ধরনের প্রশ্ন শনা যায়।

নারী সর্বহারার আন্দোলনের সাথে নারী দিবসের দীর্ঘ  মজবুত যোগসুত্র আছে। সংগঠিত নারী শ্রমিকের বাহিনী প্রতি বছর বারছে। ২০ বছর আগে খুবই অল্প সংখ্যক নারী পার্টির বিভিন্ন পদে ছড়ান ছিটান অবস্থানে ছিল। এখন ইংলিস  ট্রেড ইউনিয়নে ২ লাখ ৯২ হাজার নারী সদস্য, জার্মানিতে প্রায় ২ লাখ সদস্য ট্রেড ইউনিয়নের সাথে এবং ১ লাখ ৫০ হাজার ওয়ার্কাস পার্টির সাথে যুক্ত ,অস্ট্রিয়ায় ৪৭ হাজার ট্রেড ইউনিয়নের সাথে তার মধ্যে ২০ হাজার পার্টির সাথে যুক্ত । ইতালি,হাংগেরি,ডেনমার্ক,সুইডেন,নরওয়ে, সুজারল্যান্ড সর্বত্রই নারী নিজেদের সংগঠিত করছে। সমাজতান্ত্রিক নারী বাহিনী প্রায় ১ মিলিয়ন ছারিয়ে গেছে। একটা শক্তিশালী শক্তি। জীবন নির্বাহ, মাতৃত্ত্বকালীন রক্ষাকবচ ,শিশু শ্রম এবং নারী শ্রম সংক্রান্ত আইন প্রনয়নে   বিশ্ববাসীর  এই শক্তিকে  স্বীকার করতে হবে।

একটা সময় ছিল যখন পুরুষ ভাবত তারা একাই পুঁজির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে ভয়ানক দায়দায়িত্ব বহন করবে। নারীর সহযোগীতা ছাড়াই পুরাতন পৃথিবীকে মোকাবেলা করবে। যেহেতু নারী শ্রমিক তাদের জায়গায় প্রবেশ করেছে, শ্রম বাজারের প্রয়োজন তাদের শ্রম বিক্রিতে বাধ্য করেছে ,সত্য হচ্ছে তাদের স্বামী বা বাবা বেকার হয়েছে,ফলে পুরুষরা বুঝতে শুরু করেছে নারীদের শ্রেনী সচেতনহীন করে পিছনে রাখলে আসল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হবে। যত বেশি সংখ্যক সচেতন যোদ্ধা যুক্ত হবে ততই সফলতার সুযোগ তৈরী হবে। সমাজে,রাস্ট্রে,পরিবারে যার কোন অধিকার নেই সেই চুলার পাশের নারীর কতটুকু সচেতনতা আছে? সেই নারীর নিজেরও কোন ধারনা নেই। সবকিছু বাবা অথবা স্বামীর হুকুমেই হয়।

নারীর পশ্চাদপদতা, অধিকারহীনতা ,অধিনস্ততা বা উদাসীনতা কোনটাই শ্রমিক শ্রেনীর উপকারে আসে না বরং ক্ষতিই করে। কিন্তু কিভাবে নারী শ্রমিককে আন্দোলনে টেনে আনা যায় কিংবা তাকে জাগানো যায়?

বিদেশে সোসাল ডেমক্রেসি এর সঠিক সমাধান সহসা পায় নি। নারীর জন্য শ্রমিক সংগঠন মুক্ত থাকলেও তারা খুব কম যুক্ত হয়েছে। কেন? কারন শ্রমিক শ্রেনী প্রথমে বুঝতে পারেনি শ্রমিক শ্রেনীর একটা অংশ নারী আইনত সামাজিকভাবে সবচেয়ে বঞ্চিত, শতাব্দী ধরে তাকে চোখ রাঙ্গানো হয়েছে, ভয় দেখান হয়েছে, শাস্তি দেওয়া হয়েছে ।তাই  নারীর  হৃদয় মনকে নাড়া দেওয়ার  জন্য বিশেষ পদ্ধতি দরকার ছিল, নারী বুঝে এমন শব্দ ব্যবহারের প্রয়োজন ছিল। শ্রমিকরা সহসা বুঝতে পারেন নি যে নারী শুধু অধিকারহীনিতা, শোষণ ,শ্রম বিক্রিজনিত কারনেই শুধু শোষিত নয় সে মা হিসাবে নারী হিসাবেও শোষিত। কিন্তু শ্রমিক শ্রেনীর সমাজতান্ত্রিক দল যখন বুঝতে পারল তারা নারীর তারা নারীর ভারাটে শ্রমিক এবং মা বা নারী   দুই স্বত্বাকে রক্ষার সাহসী পদক্ষেপ নিল। সমাজতন্ত্রিরা প্রত্যেক দেশেই নারীর বিশেষ অধিকারের দাবী তুলে ধিরা শুরু করল। নারী শ্রম, মাতৃত্ত্বের রক্ষাকবচ ও শিশু শ্রম ,নারীর রাজনৈতিক অধিকার এবং নারীর স্বার্থ।

নারীর দ্বিতীয় বাস্তবতাকে  যত স্পস্ট পার্টি বুঝতে পারল তত নারী পার্টতে যুক্ত হওয়া শুরু করল।  নারী শ্রমিক সংগঠিত সচেতন হয়ে নিজেরাই এই বাস্তবতাকে অনেকটাই  স্পস্ট করল । এখন সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে শ্রমজীবি নারীদের টানার মুল দায়িত্ব নারীদেরই। প্রত্যেক দেশের পার্টিতে নারীর বিশেষ কমিটি, সম্পাদকীয় এবং ব্যুরো আছে। এই কমিটিগুলো এখন অনেকাংশে রাজনৈতিকভাবে অসচেতন নারীদের মধ্যে কাজ করে তাদের সচেতন শ্রমিক হিসাবে সংগঠিত করে। এই কমিটিগুলো সে সমস্ত প্রশ্ন এবং দাবীগুলো যাচাই করে যেগুলো ঘনিষ্ঠভাবে নারী সুরক্ষাকে প্রভাবিত করে এবং সেই আইনগুলো যেগুলি  সন্তানসম্ভবা এবং যে সন্তান জন্ম দিয়েছে ,নারী শ্রম, যৌনবৃত্তির বিরুদ্ধে,শিশু মৃত্যুর বিরুদ্ধে, নারীর রাজনৈতিক অধিকারের জন্য, উন্নত বাসস্থানের জন্য এবং জীবনযাপনে ব্যায় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে। এভাবে সাধারণ শ্রেনী স্বার্থে এবং একইসাথে  নারী ,    গৃহিনী এবং মা হিসাবে যে বিষয়সমুহ সবচেয়ে প্রভাবিত করে সেগুলো নিয়ে  নারী লড়াই করছে। পার্টি দাবীগুলোকে সমর্থন করছে এবং তাদের জন্য লড়াই করছে। শ্রমজীবী নারীর স্বার্থের সাথে শ্রমজীবী মানুষের স্বার্থ একাকার।

নারী দিবসে নারীর অধিকারহীনতার বিরুদ্ধে সংগঠিত বিক্ষোভ। কিন্তু কেউ কেউ বলবে কেন শ্রমজীবি নারীদের আলাদা করে দেখা? কেন বিশেষভাবে নারী দিবস, কেন নারীদের জন্য বিশেষ লিফলেট, শ্রমজীবী নারীর সভা, কনফারেন্স? শেষ বিচারে কি এটা নারীবাদীদের এবং বুর্জোয়া ভোটাধিকার আন্দোলনের কাছে ছাড় দেয়া নয়? তারাই এভাবে শুধু ভাবতে পারে যারা সমাজতান্ত্রিক নারী আন্দোলন আর বুর্জোয়া ভোটাধিকারের আন্দোলনের মধযে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়।

নারীবাদীদের লক্ষ্য কি?  পুঁজিবাদি সমাজের ভিতরে থেকে তাদের স্বামি,পিতা ভাই যে সুবিধা,ক্ষমতা অধিকার ভোগ করছে একই সুবিধা আদায় হচ্ছে তাদের লক্ষ্য। শ্রমজীবি নারীদের লক্ষ্য কি? তাদের উদ্দেশ্য হচ্ছে জন্মের কারনে বা সম্পত্তির কারনে মানুষ যে সুবিধাদি প্রাপ্ত হয় তা বিলুপ্ত করা। পুরুষ নাকি নারী কতৃত্ত্ব করছে শ্রমজীবি নারীর কাছে তা বড় প্রশ্ন নয়। সমগ্র শ্রেনীর স্বার্থে শ্রমিক হিসাবে সে তার অবস্থান ছেড়ে দিতে পারে। 

নারীবাদী সকল সময় সর্বত্র সমান অধিকার দাবী করে। শ্রমিক শ্রেনীর নারীর জবাব হচ্ছে  আমরা নারী পুরুষ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার চাই। আমরা এটা ভুলে যেতেও রাজি নয় যে আমরা শুধু শ্রমিক এবং নাগরিক নয় আমরা একই সাথে মা এবং মা হিসাবে নারী হিসাবে ভবিষ্যতকে জন্ম দেই তাই আমাদের এবং সন্তানদের নিয়ে আমাদের বিশেষ দাবী আছে। রাষ্ট্র এবং সমাজ থেকে বিশেষ সুরক্ষার দাবী।

নারীবাদিরা রাজনৈতিক অধিকারের জন্য লড়াই করছে। এখানেও আমাদের পথ ভিন্ন। বুর্জোয়া নারীর রাজনৈতিক অধিকার মানে শ্রমিকশ্রেনীকে শোষনের উপর প্রতিষ্ঠিত দুনিয়ায় তাদের সুবিধাজনক অধিক  নিরাপদ  অধিকার। অন্যদিকে শ্রমিক শ্রেনীর নারীর অধিকার মানে প্রস্তরময় এবং কঠিন পথে নিজেদের পরিচালিত করে শ্রমিক রাজ কায়েম করা। 

বুর্জোয়া ভোটাধিকারের জন্য যারা লড়ছে তাদের সাথে শ্রমিক শ্রেনীর নারীর যোযন যোযন দুরত্ত্ব। তাদের উদ্দেশ্যের মধ্যে বিড়াট পার্থক্য। শ্রমিক শ্রেনীর নারী এবং সম্পত্তিবান নারীর স্বার্থের মধ্যে ,মালকিন এবং চাকরানির স্বার্থের মধ্যে বিশাল দ্বন্দ্ব। তাদের মধ্যে সংযোগ, সমঝোতা, মিলন কোনটাই হয় না হতে পারে না। সুতরাং, শ্রমিক পুরুষকে আলাদা নারী দিবস নিয়ে ভীত হবার কিছু নেই, কিছু নেই আলাদা নারী কনফারেন্স অথবা বিশেষ সংবাদ মাধ্যমের।

শ্রমিক শ্রেনীর নারীর প্রত্যেকটা বিশেষ , বিশিষ্ট কাজ শ্রমজীবি নারীদের সচেতন করে উন্নত ভবিষ্যত নির্মানের আন্দোলনে সামিল করার জন্যি প্রয়োজন। নারী দিবস , ধীর ,স্পস্ট যে কাজের মাধ্যমে নারীর আত্নসচেতনতা বৃদ্ধি হবে সকলই শ্রমিক শ্রেনীর স্বার্থে, শ্রমিক শ্রেনীর ঐক্যবদ্ধতার জন্য বিচ্ছিন্নতার জন্য নয়। আসুন আমরা সাধারন শ্রেনী স্বার্থে এবং একই সাথে নারী মুক্তির লক্ষ্যে শ্রমজীবি নারীদের নারীদিবস উদযাপনে উৎসাহিত করি।

 

লেখাটি ১৯১৩ সালে প্রাভদায় প্রকাশিত হয়।