চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লব সম্পর্কে কিছু প্রাথমিক চিন্তা(Ideas)- এনভার হোক্সা

১৪ অক্টোবর,১৯৬৬ ১৮তম কেন্দ্রিয় কমিটির প্লেনামে  প্রদত্ত ভাষণ

কমরেডস, কয়েক মাস ধরে চীনে যে সাংস্কৃতিক বিপ্লব চলছে তা নিয়ে আমি কিছু প্রাথমিক মতামত/চিন্তা রাখতে চাই। আমি বলছি প্রাথমিক চিন্তা,কারন এই বিপ্লবটা একটা জটিল বিষয়,আমাদের দিক থেকে আর বেশি নজর দেয়া দরকার। সম্ভব হলে চীনের কমরেডদের কাছ থেকে পরিপূর্ন তথ্যাদি যাচাই করে পুর্ন বিশ্লেষন দার করাতে হবে। আর এই সমস্ত বিষয়কে সাথে রেখে  মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তিতে যত্নের সাথে বিষয়টি ব্যাখ্যা করতে হবে।অনেক কিছুই আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়,আমরা যা করতে পারি বা করি তা ধারনা মাত্র। দরকার তথ্যকে যাচাই করা ,জীবনকে যাচাই করা। যদিও আমাদের কাছে যথেষ্ট তথ্য নেই, তথাপি কেন্দ্রিয় কমিটিকে তার আভ্যন্তরিন  মোটামোটি ধারনার জন্য জানা তথ্যের আলোকেই বিচার করতে হবে। বিষয়টির জটিলতার কারনে সুনির্দিস্ট বিচার এবং সংজ্ঞা নিরুপন করতে না পারার সম্ভবনাকে একেবারে উড়িয়ে দিচ্ছি না। যাইহোক, আমাদের দুই পার্টির এবং আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের প্রতিধনিত হওয়ার সম্ভবনাকে মাথায় রেখে মার্ক্সবাদি-লেনিনবাদি ঐক্যের অতি প্রয়োজনে আমরা প্রথম প্রাথমিক সংক্ষিপ্ত বিশ্লেষণ(প্লেনামে এজেন্ডাভুক্ত না থাকার কারনে) এবং সমালোচনা করতে পারি। চীনের নেতারা সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লবের একক সমস্যার দুইটি দিক তুলে ধরেছেন-একটি জাতীয় অন্যটি  আন্তর্জাতিক। আমাদের পার্টিসহ অন্যান্য মার্ক্সবাদি-লেনিনবাদি পার্টি এবং সারা বিশ্বই সমস্যার দুইটি দিককে একক সমস্যা হিসাবে দেখতে আগ্রহী। সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ে নানান অবস্থান থেকে যেভাবে দেখা হয়েছে ,বিশ্লেষণ ,ব্যাখ্যা ,প্রশংসা,সমালোচনা করা হয়েছে তার মধ্যে বিশাল অনুমান   নির্ভরতা আছে। কিন্তু আমরা মনে করি যে ব্যাখ্যাসমূহ দার করান হয়েছে তার প্রধানতঃ তিনটা ধারা আছে ঃপুজিবাদি বুর্জোয়া অবস্থান, বুর্জোয়া-শোধনবাদি অবস্থান এবং মার্ক্সবাদি-লেনিনবাদি সত্যকার গঠনমূলক অবস্থান। চীনের কমরেডরা যদি সকল অবস্থানকে এক করে গুলিয়ে ফেলে তাহলে তারা গুরুতর ভুল করবেন। কেননা, প্রথম দুটি অবস্থান তৃতীয়টির সাথে পুরোপুরি উল্টো (Diametrically).এটা ঘটলে বলব, তাদের মারক্সবাদি-লেনিনবাদি অব্জেক্টিভিটির অভাব আছে। সুতরাং, কমরেডস, আপনারা বুঝতেই পারছেন যে জটিল অবস্থার কথা আমি উল্লেখ করেছি সেই অবস্থায় চীনের কমরেডদের সমন্ধে  কিংবা যে বিষয়গুলো নিয়ে আমি সমালোচনা করতেই থাকব বিশেষ করে অপ্রতিরোধ্য(unrestrained) মাও পুজা নিয়ে  সঠিক,খোলামনে,কমরেডসুলভ আলোচনা আমাদের জন্য অসম্ভব না হলেও কতখানি জটিল হয়ে গেছে। কিন্তু, আমাদের পার্টি সর্বদা যা করেছে , ধৈর্য্যের  সাথে এবং কমরেডসুলভ আচরনের মধ্য দিয়ে       চীনের কমিউনিস্ট পার্টি সমন্ধে মতামত ব্যক্ত করতে যৌথ প্রয়োজনে, মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের প্রয়োজনে মূলনীতিকে   (principles) রক্ষার জন্য সাহসের সাথে,সঠিকভাবে,নির্ভয়ে তা করে যাবে শুধু সাহস দিয়ে নয় জ্ঞান এবং ঠান্ডা মাথায় বিচার করে যা আমরা কঠিন সংগ্রামের  মাধ্যমে অর্জন করেছি যার অভাব(lacking) কখন ঘটেনি । আমাদের পার্টি এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির মধ্যে বহু বছরের চলমান সম্পর্কের কারনে যে তথ্যাদি আমরা জেনেছি ,আন্তর্জাতিক গুরুত্বপূর্ন সমস্যা এবং আন্তর্জাতিক সমস্যা নিয়ে চীন কমিউনিস্ট পার্টির দৃষ্টিভঙ্গি (view) ,দুই পক্ষের পত্র ও প্রতিনিধি মারফত বিনিময়কৃত মতামত পার্টি এবং রাস্ট্রের মধ্যে অভিজ্ঞতার বিনিময় ইত্যাদি হবে আমাদের মতামতের ভিত্তি। চীনের সর্বহারা সাংস্কৃতিক বিপ্লবের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত যে অগ্রগতি সমন্ধে আমাদের পত্রিকা মারফত জেনেছেন এবং আর বিস্তৃতভাবে ATA’র বিশাল ভান্ডার থেকে প্রতিদিন যা জেনেছেন যেগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব না সেগুলো থেকে কেবলমাত্র বিশেষ গুরুত্বপুর্ন ঘটনাগুলো স্মরণ করব। ১। ১০ বছর আগে তাদের কংগ্রেসে চীনের কমরেডরা টিটোর বিশ্বাসঘাতকতা সম্পর্কে স্পষ্ট ধারনা করতে পারেননি বরং স্তালিনকে কালিমালিপ্ত করে টিটোকে ছেড়ে দিয়েছে। এই অবস্থান সম্পর্কে আমাদের কাছে তথ্য আছে এবং সেকারনেই আমরা তাদের সাথে কথা বলা শুরু করি।  পরবর্তিতে, তারা তাদের অবস্থানকে ঠিক(correct)করে নিলেও ক্রুশ্চেভিয় মহা বিপদের কাছে টিটোয়িক বিপদকে ছোট করে দেখে চলেছে । ২ চীনের  কমরেডরা ক্রুশ্চেভিয় বিপদকে পরিপুর্নভাবে এবং সঠিকভাবে ধরতে পারেননি। স্তালিনের বিরুদ্ধে ক্রুশ্চেভিয় অভিযোগ ও অপবাদকে তারা খোলাভাবে সম্মতি দেননি কিন্তু এর অনেকগুলোই বিশ্বাস করতেন এবং এর ভিত্তিতেই স্তালিনের সময়কার কমিনটার্ন এবং তার পরবর্তী সময় সম্পর্কে তাদের চিন্তাকেই পুষ্ট করেছে। গতবার  চৌ যখন আমাদের এখানে এসেছিলেন তিনি চিনের ব্যাপারে স্তালিন কি ভুল করেছেন তা নিয়ে আমদেরকে কনভিন্স করার জন্য তার মতামত রেখেছিলেন, যদিও তিনি আমাদের কনভিন্সড করতে পারেন নি। যদি কিছু সময়ের জন্য ধরেও নিই স্তালিন সম্পর্কে চৌ এর বক্তব্য আমরা মেনে নিয়েছি ,তুলনামূলক দলিল ছাড়া এবং যেখানে বিষয়টি ঘটার দীর্ঘদিন পার হয়ে গেছে এবং অন্ততঃ আমাদের কাছে দলিল না থাকার কারনে একতরফা ভাবে সহজে ব্যাখ্যা করা যায় ,তারপরও আমরা মনে করে সেগুলো বড় কোন ত্রুটি ছিল না ,মৌলিক কোন ভুল ছিল না ।সেগুলোকে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামরিক কারনে গৃহিত বড়জোর কৌশলগত অবস্থান বলা যায়। পরবর্তিতে,তারা ক্রুশ্চেভিয় বিপদ সম্পর্কে উপলব্ধি করতে পারলেও নমনীয়তার কৌশল অবলম্বন করেন। বিশেষতঃ সি পি এস ইউ এর ২২তম কংগ্রেস এবং তার অব্যবহিত পরে আমরা যখন একাই সংশোধনবাদিদের আক্রমণের শিকার হচ্ছিলাম তখন  চীন  কমিউনিস্ট পার্টি মতবাদিক   বিতর্ক বন্ধ করার চেস্টা করছিল। ক্রুশ্চেভের পতনের অব্যবহিত পরে চীনা কমরেডরা কিছুটা পিছু হটেছিলেন এবং কিছু ভ্রান্তিকর আচ্ছন্নতায় পরে কিছু ভুল পদক্ষেপ নিয়েছিলেন। চৌ এন লাই ও  আলবেনিয়ার রাষ্ট্রদূত পর্ব এবং আমাদের দলের অবস্থান সম্পর্কে আপনারা সকলেই জানেন। চীন আর একটা ভুল অবস্থান নিয়েছিল। সেটা   হচ্ছে সংশোধনবাদিদের যুক্ত করে সাম্রাজ্যবাদ-বিরোধী ফ্রন্ট গঠনের প্রস্তাব কোরিয়া ও জাপানের মত পার্টির ক্ষেত্রে যার একটা পরিনতি ছিল। আমরা দৃড়তার  সাথে প্রত্যাখ্যান করেছি এবং তারা সে প্রস্তাব তুলে নিয়েছিল। আপনারা পরেছেন এখন কোরিয়া জাপান এই ব্যানার তুলে ধরেছে। ৩ আপনারা জানেন চিনা কমরেডদের সাথে আমাদের কিছু নীতিগত বিরোধ আছে। বিরোধটা শ্রেনীসংগ্রামের নয়, বিরোধটা হচ্ছে শ্রেনী হিসাবে সামন্তীয়-বুর্জোয়া (feudo-bourgeois)   শ্রেনীর  অস্তিত্ব নিয়ে এমনকি তারা রাস্ট্রীয় অবস্থানে থেকেও আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছে যেখানে কিনা সর্বহারার একনায়কত্ত চালু আছে। আমরা জানি, সংগ্রাম,তথ্য এবং মারক্সবাদি-লেনিনবাদি বিশ্লেষণই  আমাদের থিসিসের ভিত্তি।

চীনের কমরেডগন বিপরীতটা দাবি করেছেন। আপনারা জানেন, আমরা তাদের বলেছি এটা তাদের দেশে ঘটতে পারে কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে প্রযোয্য নয়। সামন্তীয়-বুর্জোয়া  শ্রেনী অবশেষের বিরুদ্ধে  আমরা লড়াই চালিয়ে যাব যেমন করে স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে এখন পর্যন্ত চালিয়ে যাচ্ছি। আমাদের দেশে কোন বুর্জোয়া শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত নেই। চীনারা দাবি করেছেন চীন পরিস্থিতি বিশ্লেষন করে আমরা তাদের মতকেই(ভিউ) গ্রহন করেছি। কিন্তু চেষ্টাটা তাদের বৃথা । কেননা আমাদের বিশ্লেষনের সাথে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে তারা তাদের সুর ক্ষীণ করতে বাধ্য হয়েছে। তথাপি, সন্দেহ করি এখন তারা কনভিন্সড নন এবং চিন্তা করে যাচ্ছেন আলবেনীয় বিশ্লেষণ ভুল। আমাদের প্রতিনিধি যখন চীনে গিয়েছিল তখন যৌথ বিবৃতির মাধ্যমে তাদের মতামত শেষ প্রচেষ্টা তারা করেছেন ।কিন্তু আবার তারা ব্যর্থ হয়েছেন।

৪  সোভিয়েত ইউনিয়নে শোধনবাদের আবির্ভাব  যা আন্তর্জাতিক সাম্যবাদে অত্যন্ত গুরুত্বপুর্ন সমস্যা আমাদের মতে সেটা নিয়ে চিনের বিশ্লেষনে বস্তুনিষ্ঠতার  অভাব আছে। তারা এককভাবে স্তালিনকেই দোষারোপ করেছেন । আমাদের ভুল না হয়ে থাকলে আমরা মনে করি এই বিশেষ  তাতপর্যপুর্ন  বিষয়টি ভিন্ন অভিপ্রায়ে করা হয়েছে। এই গুরুত্বপুর্ন বিষয়ে চীনের কেন্দ্রীয় কমিটির সাথে কিছু বিষয়ে আমাদের মতামতের যেমন মিল আছে আবার কিছু বিষয়ে বিরোধ আছে । মতামত,সমালোচনা, পরামর্শের পারস্পরিক বিনিময় একটা স্বাভাবিক ব্যাপার। কিন্তু মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তি ছাড়া গঠনমূলক হয় না।

চীনের সাথে আমাদের সম্পর্ক ভাল যাচ্ছে না বলে সমস্যাগুলো তুলে ধরলাম তা নয় বরং এই উল্লেখ চীনে বর্তমানে যা ঘটছে তা বুঝতেই সাহায্য করবে। তাছাড়া, আর অনেক বিষয় থাকতে পারে যেগুলো আমরা জানি না। চীনা সংবাদ মাধ্যম সিনহুয়ার মাধ্যমেই আমরা বর্তমান ঘটনা গুলি জানতে পারছি। চীনের পার্টি এবং কেন্দ্রীয় কমিটি কেউ আমাদের কমরেডসুলভ কোন  তথ্য দেন নি। আমরা মনে করি তাদের কাছের পার্টি হিসাবে আন্তর্জাতিকতার নিয়ম মেনেই তাদের উচিৎ  হবে আমাদেরকে তথ্য দেওয়া বিশেষ করে এই সময়ে।

চৌ এন লাই কি বলেছিল   আপনারা তা  জানেন । চীনের সংবাদ মাধ্যমে যা প্রকাশিত হচ্ছে তার বেশি কিছু তারা আমাদেরকে জানান নি। তারা এখন পর্যন্ত  কি করেছেন আগামিতে কি করবেন এগুলোই প্রেসে প্রকাশিত হচ্ছে। তাদের পার্টির ভিতরের অনেক খবর না থাকা সত্ত্বেও আমরা যে যুক্তিপুর্ন এবং পরিপুর্ন  উপসংহার টানতে পারছি তা থেকে আমদের বিচক্ষনতা আপনারা বুঝতে পারবেন। ঘটনার মৌলিক কারনের কিছুই আমরা জানি না  যা জানি  তা কিছুটা ঘটনার বাইরের দিক,  এগুলোর বাহ্যিক বিকাশের দিক । আমরা অনুমান করতে পারি, সাব পজিসান নিতে পারি, হাইপথিসিস করতে পারি কিন্তু সমস্যার তাতপর্য(seriousness) আমাদের পার্টিকে কোনভাবেই অবিচক্ষন হতে বা তরিঘড়ি করতে অনুমোদন করে না।

ভুল হয়ে না থাকলে ঘটনার পরম্পরা থেকে বুঝি লিন বিয়াও এর আর্মি নিয়ে লেখা আর্টিকেল থেকেই সমস্যার শুরু(matters began)।  এরকম আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে যা স্বাভাবিক আর্মিকে শক্তিশালী ও জনপ্রিয় করার বক্তব্য ছাড়া বিশেষ কিছু এই লেখায় প্রকাশ পায় নি । এটা অগ্রসর  হয়েছে কিছু উপন্যাস এবং প্রবন্ধের সমালোচনার মধ্য দিয়ে  সুর চড়া হয়েছে বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক  প্রধান এবং অধ্যাপকদের মধ্যে , আঘাত পড়েছে বেইজিং পার্টি কমিটির উপড়ে গিয়ে( পেন ঝেং এর নাম উল্লেখ না করেও বলা যায়) ,এটা ব্যুরো সদস্য যেমন লু দিঙ্গির  কাছে গেছে সেখান থেকে সেনাবাহিনিতে লিন বিয়াও এর সহকারির কাছে গেছে এবং ফলশ্রতিতে লাল ফৌজ গঠন এবং তার কর্মকান্ড। এর মধ্যে লিন বিয়াও এর দ্বিতীয় প্রবন্ধ বের হয় যেখানে মাও পূজার গায়ে  বাতাস দেয়া হয় এবং মাওএর লেখা পড়ার পরামর্শ দেয়া হয়। আপনারা এই লেখাটাকে কাজের আহবান( call to action) বলতে পারেন।

কিছু জিনিস আমাদের দৃষ্টি আকর্ষন করেছে। চৌ এন লাই যা আমাদের বলেছিল তা চীনা সংবাদ মাধ্যমে প্রাকাশিত হয়েছে যে   লু জিঙ্গি, লাও রুইকিং, এবং অন্যান্যরা পেং জেন এর নাম না থাকলেও অবশ্যই সে সহ বেইজিং পার্টি কমিটি সংশোধনবাদি, পার্টি বিরোধী এবং বুর্জোয়াদের চড়ে পরিনত হয়েছে। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে, লেখকদের মধ্যে বুর্জোয়া অনুশীলনকে সমর্থন করেছে। আর পত্রিকা অনেক লেখার( অনুবাদকের অনুমান- লেখা বলতে মাওএর লেখা বা পার্টি লেখা হতে পারে)  সমালোচনা ছেপেছে। সুতরাং, তারা সাংসকৃতিক এবং চিন্তা(the school)র অংগনে শ্ত্রুতা করেছে। যে তিন জনের নাম নেয়া হয়েছে তারা এবং অন্যান্যরা কেন্দ্রীয় পলিট ব্যুরোর সদস্য। শুধু কি একটি ক্ষেত্রে তারা  বিশ্বাসঘাতকতা করেছে ? চীন যেহেতু একটি কথাও বলছেন না তাই  এই বিষয়ে আমরা মতামত দিতে পারি না। তারা যে বড় ষড়যন্ত্রের কথা বলছেন তা কবে আবিষ্কার করতে পেরেছিলেন? তাদের কথা অনুসারে, তারা সমস্ত বিষয়, সামগ্রিক লাইন, নেতৃত্বের সমষ্টিগত এবং ব্যক্তিগত সকল কর্মকান্ড বিশ্লেষন করেছেন। এটা স্বাভাবিকভাবে করা হয় বিশেষ করে অস্বাভাবিক সময়ে। তাদের অভ্যন্তরিন বিষয় হওয়ার কারনে আমরা এ নিয়ে কিছু বলতে পারি না। আমরা শুধু প্রশ্ন রাখতে পারি তারা কেন আগেই উক্ত শ্ত্রুতাপুর্ন কর্মকান্ড ধরতে পারলেন না।

সি পি সি ‘র শেষ কংগ্রেস দশ বছর আগে অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং নতুন পঞ্চ বার্ষিক পরিকল্পনা কোন কংগ্রেসে যাচাই বাছাই ছাড়াই ক্রিয়াশীল আছে। এটা অস্বাভাবিক,বিশৃংখল এবং সংবিধানের লংঘন।   আমরা বাইরে থেকে যতটুকু বিচার করতে পারি তা থেকে আমাদের কাছে মনে হয়েছে কংগ্রেস অনুষ্ঠিত না হওয়ার কোন বাস্তবসম্মত কারন নেই। প্রশ্নটা শুধু  সাংগঠনিক নয়  প্রশ্নটা নীতিগত ;পার্টির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ত্ব সিদ্ধান্ত গ্রহন করেন না বা এর জন্য দায়ী করা যায় না অর্থাৎ এটাকে তারা অবহেলা করেছেন। কিন্তু কেন? আমাদের পক্ষে এর উত্তর দেওয়া সম্ভব নয় কিন্তু আমরা মনে করি এটা নীতিগতভাবে বিড়াট লংঘন এর পরিনতি ভয়াবহ।

কংগ্রেস নিয়ে অনেক বললাম, কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটির প্লেনামের কি খবর? মিটিং ছাড়া চার বছর? কি করে সম্ভব? ঘটনা ঘটনাই। পার্টির মূল ফোরামকে অবহেলা(অনুবাদকের মতে -শব্দটা অপমানও পড়া যেতে পারে)  করা হয়েছে। তাহলে  তারা সমস্যা কিভাবে বিচার করেছেন ? ঐক্যের নীতিতে নাকি নয়? গজামিল দিয়ে নাকি সঠিকভাবে? না জেনে আমরা কিছু বলতে পারি না। আমরা শুধু এটুকু বলতে পারি এগুলোর সবই অনিয়মিত, বেআইনি, অ-অনুমোদনযোগ্য, প্রতিবাদযোগ্য -পার্টি এবং দেশের জন্য যার পরিনতি ভয়ানক। কোন মারক্সবাদি-লেনিনবাদি পার্টিতে এরকম অনুশীলন দেখা যায় না(আশা করা যায় না পরতে পারেন-অনুবাদক)।

কি এমন বিষয় আছে যা চীনের কমরেডদের সবচেয়ে প্রাথমিক এবং গুরুত্ত্বপুর্ন  পার্টি নীতি (rules) ভাংতে বাধ্য করল? আমরা অনেক কিছু অনুমান করতে পারি ।

আমাদের অভিজ্ঞতা এবং পার্টির রীতির উপর ভিত্তি করে বলতে পারি এরকম বিরোধপুর্ন কর্মকান্ডকে আমরা ধিক্কার জানাতাম এবং অঙ্কুরেই বিনষ্ট করতাম  যেন তারা প্রতিষ্ঠিত হতে না পারে। কেননা নেতৃত্ত্বের মধ্যে ভাল- মন্দের দিকগুলো  প্রান্তে প্রতিফলিত হয়।

বিশাল কর্মিবাহিনির চীনা পার্টি নানান সমস্যা নিয়ে কমিটি এবং অঞ্চলের ভিত্তিতে বিভক্ত হয়ে কি করে পরিচালিত হয়েছে যে কেউ কল্পনা করতে পারে।

কিছু সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন নিয়ে আলোচনা করা যায়। চার বছরের ব্যবধানে সিপিসি কেন্দ্রীয় কমিটির ১১তম প্লেনাম অনুষ্ঠিত হয়েছিল।  সাম্রাজ্যবাদ,সোভিয়েত সংশোধনবাদ এবং আরও   কিছু বিষয় যেগুলো পরে উল্লেখ করব এই বিষয়গুলো নিয়ে সরকারি ঘোষনা ছাড়া তারা কি করলেন,কি আলোচনা করলেন,কি সিদ্ধান্ত নিলেন তার কিছুই আমরা জানি না।

পার্টি লাইন কি  বিশ্লেষিত হয়েছে, ভাল এবং খারাপ দিকগুলো কি উত্থাপিত হয়েছিল, যারা ভুল করেছিল তারা কি ব্যক্তিগত ও সমষ্টিগতভাবে দায়বদ্ধতার সম্মুখিন হয়েছিল ,ঠিক ঠিকভাবে এগিয়ে যাওয়ার জন্য কি কি ব্যাবস্থাপত্র গৃহিত হয়েছিল ইত্যাদি,ইত্যাদি? এগুলো তাদের আভ্যন্তরিন ব্যাপার এবং তারা কিছু বলছেন না।পরবর্তি কংগ্রেসের কোন ঘোষনা নেই মানেই হচ্ছে তারা পরবর্তি কর্মকান্ড কংগ্রেস ছাড়াই চালিয়ে যাবেন মানেই হচ্ছে তারা আভ্যন্তরিন শৃংখলা আনতে পারেন নি, জঞ্জাল সরাতে পারেন নি। আমাদের ভুল হতে পারে কিন্তু আমাদের পার্টির মতামত এবং অনুশীলনের ভিত্তিতে বলতে পারি যে নেতৃত্তের মধ্যে নানা গোষ্ঠী(factions) আছে । যদি তা হয়ে থাকে তাহলে মতামতের ভিন্নতার গভিরতা ব্যপক । যারা নানান গোষ্ঠিকে প্রশ্রয় দিচ্ছে, স্বীকৃতি দিচ্ছে সেটা শুধু পার্টি র‍্যাঙ্কের মধ্যে সিমাবদ্ধ নয়, কেন্দ্রীয় কমিটির মধ্যে এমনকি পলিট ব্যুরোর মধ্যেও ব্যাপ্ত । যে পদ্ধতি এবং  ফর্ম চীনের কমরেডগন ব্যাবহার করছেন তা দিয়ে   এই সমস্যা মোকাবেলা  করা কঠিন  ।

কেন্দ্রীয় কমিটির মিটিং থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে কি উঠে আসল?  আপনারা জানেন বিশেষ করে সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লবের ১৬ দফা ঘোষনা  উঠে আসে। লিন বিয়াও মাওএর উত্তরসূরি হিসাবে আবির্ভুত হয় এবং র‍্যাঙ্কের মধ্যে নতুন নেতৃত্তের পরিচয় ঘটে সাথে নতুন অনেকে সামনে চলে আসে এবং লিউ সাওচি সহ অন্যরা নিচে নেমে যায় । তারা অশটম-নবম থেকে আরো নিচে চলে যায়। এখান থেকে বলতে পারি একটা মিটিং হয়েছিল যেখানে কিছু বিষয় আলোচনা করে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল। এর চেয়ে কিছু আমরা জানি না।

আপনারা জানেন, প্লেনাম অনুষ্ঠিত হওয়ার পূর্বেই রেড গার্ড গঠিত হয়েছিল এবং তারা কাজ শুরু করেছিল, সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হয়েছিল সাথে অসুস্থভাবে ,কৃত্রিমভাবে মাও পূজা গগনচুম্বী হয়েছিল।সবকিছুই চলছিল মাওএর নামে , পার্টি এবং কেন্দ্রীয় কমিটির নাম কদাচিৎ উল্লেখিত হত। পার্টির অস্তিত্ত্ব,লড়াই , জনতার অস্তিত্ত্ব -লড়াই- শ্বাস সবই চলত একমাত্র মাওএর নামে। সবচেয়ে খারাপ ব্যাপার হচ্ছে মাও নিজে এটা প্রতিরোধ করেন নি। তারা কি সিদ্ধান্তে পৌছেছে যে ভিতর থেকে তাদের পার্টি ক্ষয়ে গেছে এবং একমাত্র মাওএর অথরিটিই এটাকে বাঁচাতে পারে। মাওএর অথরিটি অবশ্যই গুরুত্ত্বপুর্ন কিন্তু চীনের কমরেডদের সঠিক মার্ক্সবাদি-লেনিনবাদি পথে চলা উচিত।

স্বাভাবিকভাবে, বিষয়টা আমাদেরকে চিন্তিত করেছে এবং চিন্তার কারন আছে কারন এটা আন্তর্জাতিক সাম্যবাদের ভাগ্যের সাথে সম্পর্কিত ,চিনের ভাগ্যের সাথে,সমাজতন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত এবং আমাদের দুই রাস্ট্রের দুই পার্টির সম্পর্কের সাথে সম্পর্কিত।

চীনের কমরেডরা এই বিপ্লবকে নজিরবিহীন গুরুত্ত্ব দিচ্ছেন কিন্তু বিপ্লবের সাথে এই বিশাল গুরুত্ত্বের সম্পর্ক এখন আমাদের কাছে পরিস্কার না। ১৬ দফা মনযোগ দিয়ে পড়লে আমরা দেখব পার্টির রাজনৈতিক এবং সাংগঠনিক সমস্যার কিছু সংক্ষিপ্ত সম্পর্ক এবং কিছু সাধারণ উল্লেখ যেগুলো প্লেনামে অবশ্যই আলোচিত হওয়া উচিত ছিল এবং জনতার কাছে নিয়ে যেতে হত। কমিউনিস্টের শ্রেনীকরণের ভিত্তিতে অথবা কমিটিতে গৃহিত ১৬ দফার ভিত্তিতে লিন বিয়াও রেড গার্ডের সামনে বক্তৃতা করতে গিয়ে বলেন নেতৃত্তের মধ্যে অনেক পুঁজিপতি আছে। সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লব কিভাবে বিকশিত হবে,কোন পথ অনুসরণ করা দরকার , এর লক্ষ্য উদ্দেশ্য কি কোনটাই আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়।  পুরাতন চার জিনিসের পরিবর্তে নতুন চারটি জিনিস প্রতিস্থাপন সম্পর্কিত চিন্তা না পরিপুর্ন না স্পষ্ট ব্যাখ্যা। এমনকি পুরাতন চারের ( four old things) উপরও দৃষ্টি রাখেন তাহলে মনে হবে সাংস্কৃতিক বিপ্লব এবং সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশ নিয়ে চিনের কমরেডগণ সম্পুর্ন সঠিকভাবে ভাবছেন না। ইম্প্রেসনটা হচ্ছে- চীনে এবং বিশ্বে যা কিছু পুরাতন সংস্কৃতি  বাছবিচারহীনভাবে   তার পরিবর্তে  নতুন সংস্কৃতি যাকে তারা সর্বহারা সংস্কৃতি বলছেন তা নির্মান করা। সুতরাং, কার্টেসিয়ান তত্ত্ব(Cartesian theory) অনুসারে পুরাতনকে উপড়ে ফেলে নতুন কিছু নির্মান শুধুমাত্র মাওএর চিন্তার আলোকেই অর্জন সম্ভব ,তার লেখা ও উদ্ধৃতি পড়ে যার প্রভাব এখন চিনের সর্বত্রই পড়েছে।

On Culture and Art” নামক লেনিনের একটা লেখা দশ বছর আগে আলবেনিয়াতে প্রকাশিত হয়েছিল সেটা পুনর্বার পড়ার জন্য আপনাদের সুপারিশ করছি। সেখান থেকে একটা উদ্ধৃতি আমি পড়ছি। প্রত্যেকের উচিত ধারাবাহিকভাবে লেনিন স্তালিনের লেখা কাজকে গভীরভাবে গবেষণা করা ,খুঁজে দেখা তারা কিভাবে সমস্যার সমাধান করেছেন।

সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি সম্পর্কে লেনিন যা বলেছেনঃ

” যথাযথ ( precise) জ্ঞান এবং সমগ্র মানব সমাজের বিকাশের সাংস্কৃতিক রুপান্তর সম্পর্কে স্পষ্ট উপলব্ধি যা সর্বহারা সংস্কৃতির জন্ম দেবে -এটা ছাড়া আমরা এই সমস্যার সমাধান করতে পারব না। পরবর্তিটি অস্তিত্ত্বহীনতার মধ্যে বন্দি নয়( not clutched out of thin air); যারা নিজেদের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের এক্সপার্ট মনে করে এটা তাদের আবিস্কার নয়। এগুলো সবই বাগাড়ম্বরিতা। পুজিপতি, ভুমিমালিক আর বুর্জোয়া সমাজের মধ্যে মানবগোষ্ঠী যে জ্ঞান অর্জন করেছে তারই যুক্তিপুর্ন বিকাষই হচ্ছে সর্বহারা সংস্কৃতি। এই সব রাস্তাই এগিয়ে নিয়ে গেছে এবং সর্বহারা সংস্কৃতি অর্জন পর্যন্ত এগিয়ে নিয়ে যাবে। একইভাবে,  রাজনৈতিক অর্থনীতির নতুন রুপ দিয়ে মার্ক্স   আমাদের দেখিয়েছেন  শ্রেণি সংগ্রামের পথ, দেখিয়েছেন সর্বহারা বিপ্লবের অভ্যুত্থান এবং এর মধ্য দিয়ে কোথায় যেতে হবে তা দেখিয়েছেন । যখন প্রায়ই শুনি যুব সমাজের প্রতিনিধি এবং নতুন শিক্ষা পদ্ধতির কিছু সুনির্দিস্ট সমর্থক( advocates) পুরাতন চিন্তাকে মুখস্তবিদ্যার প্রনালী বলে অভিযোগ করে আক্রমণ করছে তখন তাদের উদ্দেশ্যে আমরা বলি পুরাতন থেকে যা কিছু ভাল তা অবশ্যই আমাদের গ্রহন করতে হবে। আমরা অবশ্যই এই বিভ্রান্ত যুবকদের কাছে কোন পদ্ধতি ধার করব না যাদের বহু বিষয় নিয়ে যানাশোনা আছে কিন্তু তার মধ্যে দশ ভাগের নয় ভাগই অনুপযোগী আর দশ ভাগের এক ভাগ বিকৃত। এর মানে এই না যে আমরা নিজেদের কমিউনিস্ট সীমাবদ্ধতায় ( communist conclusions) আটকে রাখব বা শুধুমাত্র কমিউনিস্ট শ্লোগানই শিখব।

আমাদের মুখস্তবিদ্যার দরকার নাই ঠিকই কিন্তু দরকার আছে প্রত্যেক ছাত্রকে মৌলিক জ্ঞানে বিকশিত করার। অর্জিত জ্ঞান থেকে যদি কেউ  নির্যাস নিতে পারে  তাহলে কমিউনিজম তার কাছে ফাঁকা বুলি, সাইনবোর্ড সর্বস্ব হয়ে দাঁড়াবে আর সে হবে নিতান্তই একজন দাম্ভিক কমিউনিস্ট। শুধুমাত্র তুলনামূলক জ্ঞান অর্জন করলেই চলবে না তুলনা করতে হবে সমালোচনামূলক (critically) উপায়ে যেন বাজে কিছু মগজকে আচ্ছন্ন করতে না পারে। সকল অবিচ্ছেদ্য তথ্যসম্ভারকে সমৃদ্ধ করাই হচ্ছে আজকের যুগের সুশিক্ষিতের কাজ। গুরুত্ত্বপুর্ন ও কঠিন কাজের ক্ষেত্রে যদি জ্ঞানকে ক্রিটিক্যালি প্রয়োগ না করে কেউ যদি  স্থিরিত(রুটিন-অনুবাদক) জ্ঞানের কারনে সাম্যবাদ নিয়ে দম্ভ করে তাহলে হবে তিনি একজন শোচনীয় কমিউনিস্টই বটে। এরকম ভাসাভাসা অবস্থান নিশ্চিতভাবেই গুরুতর। কেউ কম জানলে তার আর বেশি জানার সংগ্রাম করা উচিত। এটা না করে কেউ যদি মনে করে সেত কম্যুনিস্ট তার ভাল করে জানার দকার নেই, তাহলে সে আর যাই হোক কমিউনিস্ট জাতীয় কিছু হতে পারবে না। ”

একই লেখার মধ্যে লেনিন আর বলেছেনঃ

”  মার্ক্সবাদ সর্বহারার   বিপ্লবী মতবাদ হিসাবে ঐতিহাসিক গুরুত্ত্ব লাভ করেছে । কারন মার্ক্সবাদ বুর্জোয়া   ব্যাবস্থায় মূল্যবান অর্জনগুলিকে নাকচ করা দুরের কথা  দুই হাজারের বেশি সময়ের মানবজাতির চিন্তা ও সংস্কৃতির উতকর্ষের   সকল মূল্যবোধকে তুলনা করে নতুন রুপ দিয়েছে (refashioned) । খাঁটি সর্বহারার সংস্কৃতি তখনই বিবেচিত হবে যদি আমরা মার্ক্সবাদের  উক্ত ভিত্তিতে এবং একই অভিমুখে পরবর্তি কর্মকান্ড পরিচালনা করি, যদি সকল জাতের শোষণের বিরুদ্ধে শেষ ধাপের লড়াইয়ে সর্বহারার একনায়কত্ত্বের বাস্তব অভিগ্যতায় সিক্ত হয়। ”

চীনের প্রচারিত বিষয়টা স্পষ্ট না অন্তত আমাদের কাছে না যেখানে লেনিনেরটা স্পষ্ট।

চীনে যে সাংস্কৃতিক বিপ্লব পরিচালিত হচ্ছে তা কি কি নিয়ে গঠিত?

প্রতিক্রিয়াশীল কনটেন্ট থাকার কারনে রেড গার্ড রাস্তা-ঘাটের নাম রেস্তোরার নাম পরিবর্তন করছে, চরিত্র বর্ণনা করে বড় বড় পোষ্টার লিখছে যাকে খুঁশি সমালোচনা করছে। বাড়িঘর গুড়িয়ে দিচ্ছে, কুলাক আর প্রতিক্রিয়াশীলদের গাধার টুপি পরিয়ে দিচ্ছে সাথে তাদের রাস্তায়- সমাবেশস্থলে প্যারেড করাচ্ছে। বলা হচ্ছে তারা বিদেশী সাম্রাজ্যবাদীদের কবর তছনছ করছে এবং সবচেয়ে যে ভয়ংকর যে কাজটি তারা করছে তা হল পার্টি কমিটিকে আক্রমন, পাঠাগারে আগুন দেওয়া ও চিত্রকর্ম পুড়িয়ে ফেলা , পুরাতন মনুমেন্ট ধংস করা ইত্যাদি।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে রেড গার্ড যা করছে তাকে বিপ্লব বলা আমাদের পক্ষে কঠিন। পৌরসভা সাইন তুলে দিতে পারে, আইনের ভিত্তিতে একনায়কত্ত্বের সংগঠন দিয়ে ব্যাবস্থা নেয়া যেতে পারে, পার্টির ভিতরে যদি শ্ত্রু ঢুকে থাকে তাহলে পার্টি তাদের বহিস্কার (purged) করতে পারে। অথবা শেষ বিশ্লেষণে শ্রমিক শ্রেনীকে অস্ত্রের  যোগান  দিয়ে  কমিটিকে আক্রমণ করা যেতে পারে কিন্তু কোনভাবেই শিশুদের দিয়ে নয়। সাংস্কৃতিক চরিত্রের চেয়ে রাজনৈতিক চরিত্র দিতে কেন স্পর্ষকাতরভাবে এই পদক্ষেপগুলো নেয়া হল? যাদের এই দায়িত্ত্ব দেয়া হয়েছে তাদের স্কুল বন্ধ, বছরখানেক সংস্কৃতি অর্জনের জন্য স্কুলে যাবে না। মাওএর উদ্ধৃতি সংবলিত লাল বই তাদের ধরিয়ে দেয়া হয়েছে, বাহুতে লাল ফিতে বাঁধা, তাদের চেঁচামেচি করার অধিকার দেয়া হয়েছে।

সাংস্কৃতিক বিপ্লবের অগ্রপথিক কারা? কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় এবং স্কুলের ছাত্র। চীনের সরকারি ঘোষণা অনুসারে এদের পেছনে আছে শ্রমিক,সৈনিক,কৃষক। আমাদের কাছে মনে হয়েছে এরকম হতে পারে কিন্তু বিষয়টা সঠিক নীতিগত হয় নি। এটা গুরুতর বললে ঠিক হবে না এটা ভয়ানক। সমাজতান্ত্রিক সংস্কৃতি বা সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লব চীনারা এভাবেই বলছে এটা চীনাদের গৃহিত নীতি ও পথে(form) অর্জন  সম্ভব নয়।

সমাজতান্ত্রিক সাংস্কৃতিক বিপ্লব একটা ভীষণ  গুরুতর,একটা  বিড়াট জটিল সমস্যা যা পার্টির বিশেষ যত্নে  অবশ্যই  পরিচালিত হওয়া  উচিত এটা চীনের কমরেডগণ জানেন( বলেন যে তারা জানেন), এর জন্য সদা সতর্ক প্রহরা দরকার, দেখা দরকার লাইন ঠিক আছে কি না, বাস্তবায়ন ঠিকমত হচ্ছে কিনা পরীক্ষা করা, ভুলগুলো শুধরে নেয়া, ডান এবং বাম বিচ্যুতি খেয়াল করা কারন এরকম একটা বৃহত ব্যাপারে এরকম ঘটনা ঘটার ঝোঁক থাকে।

কেউ মনে করতে পারে সাহিত্যে ভীষণ বিরোধের অবস্থা দেখে( কেন তারা আগে দেখে ব্যাবস্থা নিতে পারলেন না ?), অনেক পার্টি ক্যাডারের ভিতর পুঁজিবাদী পথে হাটা দেখে(কেন তারা আগে দেখে ব্যাবস্থা নিতে পারলেন না ?), তারা  গভীর ঘুম থেকে জেগে বুঝলেন যে পুঁজিপতি ,কুলাক এত শক্তিশালী হয়েছে যে তারা এখন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত আছে ( কেন তারা এটা হতে দিলেন?) – সম্ভবত  এগুলো দেখেই চীনের কমরেডগণ সিদ্ধান্তে এসেছেন যে সর্বহারার সাংস্কৃতিক বিপ্লবের মাধ্যমে এগুলোর সমাধান করবেন। রেড গার্ড যুবকদের দিয়ে গঠিত এবং  মাও পুজা একটা চমৎকার স্তরে পৌচেছে।

বিষয়টা আমাদের কাছে  পরিস্কার না। দেখে মনে হচ্ছে মাস লাইনের সঠিক শ্লোগান তারা নিয়েছে, কিন্তু এরকম মাস লাইন যা সকল রীতি নীতিকে অগ্রাহ্য করে ,পার্টিকে অবহেলা করে, ব্যক্তিবাদের উপর ভর করে ,অ-সর্বহারার যুবকদের প্রশংসা করে যে যুবকেরা পার্টি এবং নানান ব্যাক্তিবর্গের অর্জনকে আত্নসাত করছে তা দিয়ে পার্টির মাস লাইনের আস্থা দুর্বল হবে ,নৈরাজ্যের সৃস্টি হবে।

আমরা মনে করি সমগ্র পার্টি লাইনের শুদ্ধিকরনের জন্য   সাংস্কৃতিক বিপ্লব হতে পারে ,কিন্তু লেনিনিয় পার্টি রীতি এবং সর্বহারার একনায়কত্ত্বের আইনের বাইরে গিয়ে  করলে পরিপক্কতার অভাব ঘটতে পারে এবং জনজীবনে সমস্যা তৈরি হতে পারে ।  যেখানে মাও পুজার উপর  ভিত্তি করে জনতা ঝাপিয়ে পড়ছে যেখানে সাধারন জনতা সহজে আত্নহারা হতে পারে ।

চীনের কমরেডগণ যদি তাদের ভুল শুধরে না নেন তাহলে সহসা অথবা পরে এর গুরুতর পরিনতি দেখতে হবে। স্তালিনের মৃত্যুর পর সোভিয়েত ইউনিয়নের অভিজ্ঞতা আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে।

আপনারা বুঝবেন, আমি অনেক বিষয় আলোচনা করলাম অনেক বিষয়ের মূল্যায়ন করার চেষ্টা করলাম সেগুলো  তথ্য না থাকার কারনে ভুল হতে পারে ।বিষয়গুলো চীনের তথা চীন কমিউনিস্ট পার্টির আভ্যন্তরীণ বিষয়- তারা মতামত না চাইলে আমাদের মতামত রাখার কোন অধিকার নাই। কিন্তু সাধারন বুঝের জন্য এমনকি সাময়িকভাবে হলেও যে  বিষয়গুলো   অস্পষ্ট   এবং যেখানে ভুল সিদ্ধান্ত থাকার সম্ভবনা আছে সেখানে আভ্যন্তরীণ মতামত না রাখাটা অগ্রহনযোগ্য। একইভাবে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের মত গুরুত্ত্বপুর্ন স্বার্থে বিচক্ষণতা এবং সতর্কতার অভাব থাকা আমাদের জন্য কাম্য নয়। আমরা এই প্রশ্নে গভীর মনযোগ রাখছি  যাতে   নিজেরা  ভুল এড়াতে পারি ,আর সুযোগ হলে সাধারন স্বার্থে চীনের কমরেডদের সাথে কমরেডসুলভ উপায়ে মতবিনিময় করতে পারি।

যাইহোক, যা কিছু চীনে ঘটছে তার সবটাই তাদের আভ্যন্তরীণ ব্যাপার না । ব্যাপারটা যেমন তাদের একই সাথে আন্তর্জাতিক চরিত্র থাকার কারনে আন্তর্জাতিক বটে। কেননা, চীন অনেক বড় দেশ এবং আন্তর্জাতিক সাম্যবাদি আন্দোলনে তার বিড়াট প্রভাব আছে।

চীনের নেতারা এবং তাদের সংবাদমাধ্যম বলছে সাংস্কৃতিক বিপ্লব গোটা পৃথিবীকে নাড়িয়ে দিয়েছে। এটা সত্য।   অক্টোবরের ১ তারিখ চৌ এন লাই বলেন, ” সাংস্কৃতিারা ক বিপ্লবকে কেন্দ্র করে পৃথিবী দুই ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। একটা শ্ত্রুদের  যারা  আমাদের বিরোধ করছে আর অন্যটা বন্ধুদের যারা আমাদের সাথে আছে এবং আমাদের রক্ষা করছে।

এটা সুনির্দিস্টভাবে  চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের আন্তর্জাতিকতার দিক । আমি জাতীয়তার দিকটা নিয়ে আলোচনার পর এই দিকটা নিয়ে আলোচনা করতে চাই।

আজকে চীনের কমরেডগণ এবং প্রচার বিভাগ সমস্যাকে যেভাবে উপস্থাপন করছেন,” বর্তমান যুগ মাও এর চিন্তা ধারার যুগ(epoch), মাও সেতুং আজকের যুগের শ্রেষ্ঠ মার্ক্সসিস্ট, মাও সকল মার্ক্সবাদি-লেনিনবাদি ধ্রুপদ, মার্ক্সবাদি-লেনিনবাদি বিজ্ঞান ও বিশ্ববিজ্ঞানের  উত্তরসূরি,  তিনিই কেন্দ্র( sun)। সুতরাং, মাওএর চিন্তার আলোকের সমগ্র পৃথিবীর চলা উচিত  আর সাংস্কৃতিক বিপ্লবকে মাও ব্যক্তিগতভাবে পরিচালনা ও বিকশিত করছেন। এরকম দাবি বিশ্ব ইতিহাসে নজিরবিহীন।

এভাবে উপস্থাপন সঠিক নয়। মার্ক্সবাদ অনুসারেত নয়ই সাধারণ সৌজন্যবোধ থেকেও নয়। সবচেয়ে ভয়ানক এবং ক্ষতিকর যে দিক তা হচ্ছে যে বেঠিক এবং ভ্রান্তিপুর্ন পদ্ধতি তারা নিজেরা ব্যাবহার করছেন সেটা অন্যদের উপরেও গোড়াভাবে আলোচনা ছাড়াই  চাপাতে চান । আর তা না করলে তাদের কথা অনুসারে শ্ত্রুর কাতারে পরতে হবে।

এখন আমাদের জন্য কিছু বিষয়ঃ

ক। আমি কিছু বিষয়ে জোর দিতে চাই যেগুলো পার্টিকে অবশ্যই ভালভাবে বিবেচনায় নিতে হবে এবং যেগুলো প্রত্যেক সমাজতন্ত্রিকে প্রতি অবস্থানে নির্দেশনার অপেক্ষা না করেই মাথা ঘাটিয়ে কাজ করা উচিত। পার্টির অবস্থান হচ্ছে -কমিউনিস্ট এবং ক্যাডারদের কংগ্রেসের,কেন্দ্রীয় কমিটির, পলিট ব্যুরোর এবং সরকারের নির্দেশনা অনুসারে পরিচালনা করা উচিত। এগুলো নানান দলিলে দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের এগুলো ধারন করে নিজেদের পরিচালনা করা উচিত।

খ। সাম্রাজ্যবাদ এবং আধুনিক সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে আমাদের পার্টি লাইন সঠিক। তাই, আমরা এটাকে দৃঢ়ভাবে এগিয়ে নিয়ে যাব কারন এর সিদ্ধান্ত হয়ে গেছে।

গ। আমাদের পক্ষ থেকে চীনের সাথে অর্থনৈতিক এবং বন্ধুত্তপুর্ন সম্পর্ক চালিয়ে যাওয়া হবে এবং মার্ক্সবাদি-লেনিনবাদি পথে বিকশিত করা হবে।

ঘ। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ মেনেই যা কিছু করেছি সেভাবেই মাও অথবা যেকোন ব্যক্তিপুজার বিরুদ্ধে লড়ে যাব । এক্ষেত্রে সামান্যতম ছাড় বা সুবিধাবাদের সুযোগ নেই। এই প্রশ্নে আমাদের পার্টির সঠিক অবস্থান সম্পর্কে চীনের কমরেডদের স্বচ্ছ ধারনা রাখতে হবে। এমনকি তারা যদি  আমাদের অবস্থান নিয়ে পরিস্কার ধারনা না নেন বা অন্যভাবে নেন সেক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নেই, কারন এটা নীতিগত বিষয়। মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের ভিত্তিতে এবং রীতিতেই আমরা মাওকে শ্রদ্ধা করি। মাওএর বিষয়ে আমরা আমাদের পার্টির আনুষ্ঠানিক বর্ণনা ব্যবহার করব।

ঙ। আপনারা খেয়াল করেছেন সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ে চীন যেভাবে প্রচার চালাচ্ছে ঠিক একই কায়দায় একই পরিভাষায় আমাদের পত্রিকা লিখছে না । আমরা কমরেডসুলভ উপায়েই এরকমটা করা থেকে বিরত থাকছি এবং একই সাথে ব্যাপারটাকে সংঘুব্ধতায় নিয়ে যাচ্ছি না। কেন করছি না উপরে তা আলোচনা করেছি। সম্ভবত এবং সন্দেহাতিতভাবে বলতে পারি আমাদের এরকম অবস্থান তাদের পছন্দ হয় নি। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের কিছু করার নেই যতক্ষন না বিষয়টা আমাদের কাছে আর পরিস্কার হচ্ছে এবং সঠিক বলে প্রতিয়মান হচ্ছে।

চ। সংস্কৃতি থেকে মাওএর কর্মকান্ড-লেখা(works) শুরু করে সকল ক্ষেত্রে চীনের বিরুদ্ধে আমাদের প্রচারনা সঠিক রীতিতে হতে হবে। চীনের কমরেডদের পক্ষ থেকে যে কোন অযাচিত আবদারকে কৌশলে এড়িয়ে যেতে হবে ,ছাড় দেওয়া এবং গোঁড়ামিপুর্ন দলভুক্ততা পরিহার করে চলতে হবে ।কারন সাম্যবাদের প্রয়োজনে মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদের সঠিকতা নির্মান এবং তাকে শক্তিশালী করার যে বিশাল দায়িত্ত্ব আমাদের উপরে আছে এগুলো করে তার কোন কাজেই আসবে না।

আমি মনে করি অনেক প্রশ্নে পার্টি লাইনকে রক্ষা করে রিপর্টি আমরা কংগ্রেসে পেশ করব যেখানে চীনের কমরেডের প্রতি আমাদের অবস্থান পরোক্ষভাবে সংজ্ঞায়িত হয়েছে। বিশেষ করে ব্যক্তিপুজা এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লব নিয়ে আমাদের মনোভাবকে তারা আপত্তি হিসাবে গ্রহন করবেন বলে আশা করি। আমাদের কংগ্রেসে চীনের প্রতিনিধি আসবেন আশা করি আমরা আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট করতে পারব কমরেডদের যেভাবে করা উচিত।

এই আমার বলার ছিল। আমরা সমস্যাটিকে সঠিকভাবে দেখছি কি না কেন্দ্রীয় কমিটি পরামর্শ দেবেন। আমি মনে করি সব বিষয় কেন্দ্রীয় কমিটির ত্তত্ত্বাবধানে হওয়া উচিত কারন তারা অনেক বেশি সক্ষম।

কেন্দ্রীয় কমিটির সমগ্র প্লেনাম কমরেড এনভার হোক্সার সাথে একমত পোষন করেছেন।

অনুবাদক কতৃক কিছু শব্দ বা শব্দবন্ধের পরিচিতি প্রদানঃ

চারটি পুরাতন জিনিস( four old things):চীনের সাংস্কৃতিক বিপ্লবে চারটি পুরাতন জিনিসকে ধংস করার কথা বলা হয়। এগুলো হল- পুরাতন প্রথা, পুরাতন সংস্কৃতি, পুরাতন অভ্যাস ও পুরাতন চিন্তা।

কার্টেসিয়ান ত্তত্ত্বঃ দার্শনিক গনিতবিদ রেনে দেকার্তের দর্শন কার্টেসিয়ান বলে পরিচিত। তার ত্তত্ত্ব অনুসারে বস্তু এবং আত্না দুটি ভিন্ন এনটিটি(অস্তিত্ত্ব), তার দর্শন বস্তু সম্পর্কে সকল গতানুগতিক ধারনাকে নাকচ করে যুক্তির সায়ত্ত্বশাসনকে প্রতিষ্ঠা করে।

২২তম কংগ্রেসঃ সোভিয়েত ইউনিয়নের এই কংগ্রেস ১৯৬১ সালে অনুষ্ঠিত হয়। স্তালিনীয় নীতি আঁকড়ে ধরে থাকার জন্য আলবেনিয়াকে আক্রমণ করা হয় কংগ্রেসের মাধ্যমে।

সমস্ত বোল্ড অংশ অনুবাদকের আগ্রহে।

Advertisements

বাংলাদেশের বাম আন্দোলন প্রেক্ষিত

মাতিন ভাই, প্রচলিত ধারায় অন্দোলন হয়ে আসছে অনেক দিন ধরে। বৃত্তের বাহিরে এসে ফলাফল বিচার করলে প্রাপ্তির খাতায় কয় নোক্তা পড়েছে তা বিবেচনা করা দরকার। এই থ্রেডে আপনার বিস্তারিত মতামত আশা করছি। শ্রদ্ধেয় রনি ভাইএর মতামতের প্রেক্ষিতে আমার নিম্নোক্ত মতামত

রনি ভাই, আন্দলনের ফলাফল বিচারের প্রশ্নে আপনার সাথে আমি সম্পুর্ন একমত। যদিও আমার মত ক্ষুদ্রের পক্ষে উক্ত বিষয়ে মতামত রাখাটা ধৃষ্টতারই শামিল। তবুও মতামত রাখব। যেহেতু  মতামতটা আমারি। এখানে আমার ছাড়া অন্য কারো দায় নাই বলে।

মূল আলোচনায় যাওয়ার আগে আপনার প্রদত্ত মতামতে ব্যবহৃত দুটি শব্দ নিয়ে আলোচনা তথা কিছু কথা বলা প্রয়োজন মনে করছি। না হলে আমার পক্ষে অগ্রসর হওয়াটা একটু কঠিন ।

প্রথমতঃ ” প্রচলিত ধারায় অন্দোলন হয়ে আসছে অনেক দিন ধরে” বাক্যটিকে একটি সমালোচনা হিসাবে গন্য করছি। প্রচলিত ধারা বলতে কি বুঝিয়েছেন সেটা আমার কাছে সুনির্দিস্ট নয়।

এটাকে ব্যবচ্ছেদ করলে  দুটি অংশ পাওয়া যায়। আন্দোলন এবং সেটা প্রচলিত ধারায় পরিচালিত। আর আন্দোলন(movement) বলতে আমি কিছু মানুষের বা জোটের নড়াচরাকে বুঝে থাকি। সেটা গান বাজনা থেকে শুরু করে সামাজিক- রাজনৈতিক সকল নড়াচরার ক্ষেত্রেই প্রযোয্য।

আপনার মতামত থেকে যা বুঝেছি- নড়াচরাটুকু আছে বলেই আপনি স্বীকার করেছেন। আপনার অভিযোগ এর উপায় নিয়ে। প্রচলিত ধারায় হয়ে আসার অভিযোগ। সত্যিই দূরহ !

আচ্ছা, প্রচলিত ধারায় কি কি ফর্ম আছে? এ সম্পর্কে আমার গভীর কোন জানা শোনা নেই। সাদা চোখে যা দেখি সাদা মনে যা বুঝি তা থেকে বিশেষ কয়েকটা ফর্মের কথা বলতে পারি। সেগুল হল-

কতিপয় মানুষের বা জোটের কিছু বিষয়ে একত্রিত হওয়া । সেগুলো প্রচারে নিয়ে আসা। প্রচারের জন্য লিফলেট,প্যাম্ফলেট,পত্রিকা,বই প্রকাশ ও বিলি করা। চিৎকার করে মিছিল করে সমাবেশে  বক্তব্য পেশ  করা। জঙ্গি মিছিল,ঘেরাও, পদযাত্রা,লংমার্চ,ধর্মঘট, গন-অভ্যুত্থান,সশস্ত্র লড়াই ।আরো হয়ত অনেক কিছু।

উক্ত ফর্মগুলিকে কি প্রচলিত বলবেন? অবশ্যই বলবেন। আজ পর্যন্ত উক্ত ফর্মগুলোই সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসাবে কাজ করেছে।এইখানে আমার সংক্ষিপ্ত মতামত জানিয়ে রাখি। এই ফর্মগুলোর যথাসময়ে যথাযথ ব্যবহারের মধ্য দিয়েই বাংলাদেশের সমাজপরিবর্তন সাধিত হবে।

দ্বিতীয়তঃ বৃত্তের বাইরে এসে ফলাফল বিচারের কথা বলেছেন ।ফলাফল বিচার অবশ্যই করতে হবে। কিন্তু তা শুধু বৃত্তের বাইরে এসে কেন? সেটা কি অধিক ফলপ্রসূ? নাকি বৃত্তের ভিতরে যারা অবস্থান করে তাদের মানসিক রেজিমেন্টেড অবস্থানকে সমস্যা মনে করছেন ?এক্ষত্রে আমি বলতে পারি বা চাই যে উক্ত অবস্থানজনিত সমস্যা শুধু বৃত্তের ভিতরেই অবস্থান করে না । বাইরেও করে। আর এই সমস্যার সমাধান মনে করি ভিতর-বাইরের পলিমিক্স । তীব্র পলিমিক্স।

এবার ,একটু ভিন্ন আঙ্গিকে আলোচনা করা যাক। ধরে নিই ,আপনার অভিপ্রায়টা ছিল প্রচলিত ধারায় আন্দলনের পরিবর্তে প্রচলিত ধারার আন্দোলন কে অভিযুক্ত করা প্রসঙ্গে। অর্থাৎ, সংগঠন সমুহ কাদের নিয়ে গঠিত ,কোন ফর্মগুলি সচরাচর ব্যবহার করছে, শ্রেণীসংগ্রাম পরিচালনার জন্য দীর্ঘমেয়াদী কোন আন্দোলন পরিচালনা করতে পারছে কিনা বা করছে কিনা অথবা কোন বিশেষ  জাতের আন্দোলন করার বিশেষ ঝোক আছে কি না ইত্যকার নানান প্রশ্ন আসতে পারে ।আমি মনেও করি সমস্ত বিষয় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে আলোচনার কোন বিকল্প নাই। তবে এই স্বল্প পরিসরে এবং আমার স্বল্প জ্ঞানে এত বৃহৎ বিষয় নিয়ে আলোচনা করা একরকম অসম্ভব। অন্যত্র, অন্য সময় সুযোগ হলে ধরে ধরে কথা বলার ইচ্ছা থাকল। তাই ,সংক্ষিপ্তাকারে মোটা দাগে কিছু মতামত রেখে যাচ্ছি।

যদিও আলোচনার স্বার্থে গোটা বামপন্থি আন্দোলনকেই আমি বিষয়বস্তু হিসাবে নিচ্ছি,আমার পরামর্শ(দয়া করে এটাকে ধৃষ্টতা হিসাবে নেবেন না) হচ্ছে সুনির্দিস্ট করে দেখার। না হলে বড় ভুল হবার সম্ভাবনাই বেশি।

আমি আন্দোলনের কাল (ইতিহাস) হিসাবে ২০০০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সময়কে নিয়েই আলোচনা করতে চাই। কারন সময়টা আমার -আমাদের সময়। ৯০’র আন্দোলন বা তারও অতীত নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচকের অভাব নেই। সেটা আপাতত তাদের কাছেই ছেড়ে দিলাম। আর একটা কারন হচ্ছে উক্ত সময় নিয়ে আলোচনা করতে গেলে চর্বিত-চর্বনই বেশি হয়ে যাবে -ইতিহাস চর্চার বিশেষ হেজিমনি থেকে বের হতে না পারার ফলে। এই দায় আমারি।

হ্যা, আমি মনে করি ,বাংলাদেশের বামপন্থি আন্দোলনে এখন পর্যন্ত মূল ভুক্তি হিসাবে মধ্যবিত্ত- নিম্নবিত্ত পেটিবুর্জোয়া শ্রেনীরই প্রাধান্য। দল হিসাবে কোনটা শ্রমিক শ্রেনীর দল কোনটা পেটিবুর্জোয়া শ্রেনীর দল সেই অভিযোগ নিয়ে আলোচনা করছি না। আমি বলছি যে শ্রেনীর মানুষ এই সংগঠন সমুহে যুক্ত হচ্ছে। এবং যে আন্দোলন  পরিচালিত হচ্ছে অর্থাৎ যে  programme গুলি দেখা যাচ্ছে সেগুলো উক্ত শ্রেনীর আশা আকাঙ্ক্ষাকেই ধারন করা। যেমন সার, তেল-ডিজেল- বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদ এবং ততজনিত আন্দোলন মোটা দাগে উক্ত শ্রেনীসমূহের আকাংক্ষাকেই প্রতিফলিত করে। অর্থাৎ যে ভুমিহীন তার ক্ষেত্রে সারের দাম বাড়া কমার সাথে মোটা দাগে খুব একটা সম্পর্ক নেই। তবে আমি এটা বলছি না যে সকল আন্দোলনই পেটিবুর্জোয়া শ্রেনীর স্বার্থ রক্ষাকারী অর্থনীতিবাদি আন্দোলন। কারো কারো programme এ রাজনৈতিক কর্মসূচী যুক্ত যে কর্মসূচীগুলি turning point এ নিয়ে যেতে সহযোগীতা করবে। ছত্র আন্দোলনের বিষয় দিয়েই বিষয়টা বোঝান যেতে পারে। ১৯৯৯ সাল থেকে আদ্যাবধি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮ দফা দাবিতে একটি আন্দোলন পরিচালিত হচ্ছে।দাবীগুলো নিছক অর্থনীতিবাদি বলতে পারেন। যেমন স্বতন্ত্র পরীক্ষা হল নির্মান ,ক্লাসরুম নির্মান শিক্ষক নিয়োগ ইত্যাদি। কিন্তু দফা নং ৮ কে আমি মনে করি একটি রাজনৈতিক কর্মসূচী। জেলায় জেলায় সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় নির্মানের দাবি। যেখানে বুর্জোয়ারা সকল কিছুকে পন্যে পনত করতে চায় সেখানে উক্ত দাবি বুর্জোয়া শিক্ষা দর্শনের প্রতি চ্যালেঞ্জ। একটা ফেজ(phase) পর্যন্ত এই আন্দোলন ছাত্র আন্দোলনে খুবই গুরুত্বপুর্ন ভূমিকা রেখেছে। তারপরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষ বাস্তবতায় সেটা শ্লথ হয়ে যায়। এইখানেই নতুন ফেজ এ নিয়ে যাওয়ার জন্য চিন্তা করার বিষয় আছে।

তবে , পেটিবুর্জোয়া শ্রেনী থেকে আসা মানুষের মধ্য থেকে দলে দলে  declassed intelligencia ,professional revolutionary গড়ে ওঠা ছাড়া শ্রমিক-কৃষক তথা শ্রেনী আন্দোলন গড়ে তুলা সম্ভব না ।এটা বারবার নিজের অভিজ্ঞতায় প্রমাণ পেয়েছি। এভাবে কৃষক আন্দোলন ও শ্রমিক আন্দোলনেরও উদাহরন দেয় যেতে পারে। বলা যেতে পারে মৎস্যজীবীদের জল-মহালের দাবী, ভুমিহীনদের মাঝে খাস জমি বন্টনের দাবী, এবং উক্ত আন্দোলনকে কেন্দ্র করে চাঁদপুরে আমরা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হতে দেখেছি বাম নেতৃত্বেই। গাজীপুরের প্যান্ডোরা গার্মেন্টস’এ ৩ মাস ধরে একটি আন্দোলনকে সুশৃংখলভাবে পরিচালনা করে দাবী আদায়ের দিকে নিয়ে যেতে পারা বা নারায়নগঞ্জের শ্রমিক অভ্যুত্থান এক একটি জ্বলন্ত উদাহরন।

উদাহরনগুলি নিয়ে আসলাম একটা বিষয় দেখানোর জন্য যে  বামপন্থী আন্দোলনে প্রচন্ড সুবিধাবাদ যেমন আছে একই সাথে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে পৌছানোর আন্তরিক প্রচেষ্টা ও আছে। সত্যিকার অর্থে সারাদেশব্যাপী শ্রেনী আন্দোলন গড়ে তুলবার জন্য যে কর্মসূচী দরকার সেটা দেখতে না পারার বেদনা, ক্ষোভ আমারো আছে। তবে সেটাকে কোনভাবেই অস্থিরতার ফাঁদে পড়ে বিচার করা সঠিক মনে করছিনা।

ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতা থেকে আরেকটি কথা বলতে চাই। সেটা হলো পেটিবুর্জোয়া থেকে আসা কর্মী বাহিনীর মধ্যে যে রুচী-সংস্কৃতি-অভ্যাসের সমস্যাগুলো আছে সেগুলো থেকে বের করার জন্য Inner-struggle এর অংশ হিসেবে কর্মসূচী প্রয়োজন। তা না হলে, হাজার চেষ্টা করেও আন্তরিকতা থাকা স্বত্বেও অভিষ্ট লক্ষ্যে পৌছানো সম্ভব হবেনা।

শূন্যতা

আনন্দ এখন চরাচরে নিষ্কলুষ নীলে আর

নির্মল ছন্দিত সমীরণে দেহপল্লব ছাড়িয়ে

আরও অনেক দূরে হৃদয়মন্দিরের মেলা অব্দি

এ গাঁয়ে একটি সমুদ্রের আজ গম্ভীর গর্জন

বারশত নদী মায়াময় মাঠ-ঘাট-জনপদ

শূষে নেয় তার কলতান বুকে উষ্ণ স্পর্শ নিয়ে

নৌকাগুলো দৈবাৎ জীবন্ত পাল তুলে জুড়ে দিল

নাচ । শুধু কি তাই? হঠাৎ বাদামী বর্ণের ফ্রেমে

বন্দি হল স্মৃতিনিপিড়ীত ভাতিয়ালির জোয়ার

আজ প্রাণ-ভোম্রা থেকে মুক্তি পেয়েছে আমার প্রাণ শব্দগুলি

বহুবর্ণিল মাছের সাথে জেগেছে সাঁতার দিয়ে

পাখিদের সাথে উড়ে উড়ে নীলের সাথে মিতালি

করেরেশ্মি-নরম রোদ গাঁয়ে মেখে ভ্রমরের

মতন আমারি চারিপাশে খেলা করে কতশত

রঙের বর্ণে-অক্ষর-শব্দ কত কতইনা আকৃতি

আমি দেখছি, অনুভব করছি, স্পর্শ করছি। ভাবতে পার

একজন মুরতিকারিগরের পাশে থরে থরে রং,

তুলি,খাঁটিমাটি পরিপাটি করে সাজানো থাকলে

কেমনটা তার লাগে তখন!শান্ত? স্তব্ধ? সমাহিত?

 

গীতা, আমি তোমাকে বোঝাতে পারবনা ঐ হাহাকার

কতখানি ব্যপ্ত কতকিছু বিদির্ণ করতে পারে

এই অসম্ভব গাঢ় কষ্ট জন্মের আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত

হওয়া অবধি শুরু

শুন্যতার বয়স দিনকে দিনকে বেড়ে চলেছে

নতুন করে প্রেম হল না কেন এরকম ছ্যাবলামি

কখনও করিনি সেটা তুমি আজ ভাল করে জান

তবে, হ্যা, মানছি, কিছুকিছু অনুভুতি বারেবারে

পাঁজরের খাঁচা ধরে তীব্র নাড়া দেয় অনিবার

তারও নিয়ন্ত্রন আমার পায়ে পায়ে বারেবারে

সেটার পাছায় কষে লাথি মেরে যদ্দুর সম্ভব

ফুটবলের মত আকাশে তুলে দিই আবর্তনের নিয়মে

আবার ফেরে, যাওয়া আর আসা মেতে আছি এও

এক খেলায় কিন্তু বিশ্বাস কর গীতা আস্থা রাখ

বিশ্বাসিনী একমাত্র আমার একমাত্র শূন্যতা ছাড়া

কোনকিছু আমার অস্তিত্বে এভাবে বিদ্রুপ করা

দূরে থাক সাহস করেনি

 

 

তোমায় শ্রদ্ধাঞ্জলি হে অক্ষর শ্রমিক

ইচ্ছা করছে পুড়া ভুখন্ডকে এক তাল পিণ্ড বানিয়ে আকাশে ছড়িয়ে দিই

ইচ্ছা করছে সমস্ত জলরাশিকে তোলপাড় করে দিয়ে

ভেজা নেকড়ার মত নিংড়ে নিয়ে হাইড্রোজেন অক্সিজেন বাতাসে মিলিয়ে দিই ।

যদি এক টুকরা বারুদ হতে পারতাম

কিংবা নিতান্তই ঘুনে পোকা

তাহলে তাবত অক্ষর কারখানাকে ছারখার করে দিয়ে

শ্রমদাসত্ব থেকে তোমাকে মুক্ত করে দ্বিতীয় জন্মের ঋণ শোধ করতাম,

কিন্তু না কিছুই হবার নয় যদিও তুমি মেরুদণ্ড খাড়া করে রাখতে বলেছিলে ,

চার দশক বিভিষিকায় কেটে গেল

তিলে তিলে মস্তক নোয়াতে নোয়াতে আর উপরে তুলতে পারি না

আজ আমি তিন মাথাওয়ালা পোদনির্ভর এক হাস্যকর প্রাণী ।

কতকাল নীলাকাশ দেখি না !

একটুও গুমড়ে কাদি না

ভাবছ? যন্ত্রনায় আকাশের নীল গাঢ় হয়ে নিম্নাঙ্গে ছায়া ফেলে

মোটেও না তথাপি

আজকে ভীষণ লজ্জা পাচ্ছি আমার অক্ষমতার জন্য

শ্রীহিন কংকালের জন্য

এ বস্তু আমার একার

কাল-রাস্তা

বোধ করি বাহনটা সঠিক-ই ছিল। মানে পথের পরিমাপে প্রয়োজনীয় গতি সাপেক্ষে। আমি সর্বান্তকরণে চালক বলিতে নমঃ নমঃ। চালক-আরোহীর ক্ষিপ্রতায় পথ ক্রমাগত সরে যায়।ছায়া-বীথির মাঝ বরাবর,কখনও মিষ্টি রোদ গায়ে মেখে ,ফুরফুরে বাতাস লাগিয়ে ধেয়ে যাচ্ছি।

আহা! পথের আনন্দ যে এত মধুর জীবনে কল্পনাও করিনি। অবশ্য পথ বলতে নির্দিষ্ট পথ -চেনা পথ ,একেবারে মুখস্ত পথ।

বেশ মুশকিলে পরা গেল । যত অগ্রসর হই ততই ধাঁধা লাগে।পথ-সংক্রান্ত পরস্পরের সংশয় জাগে। ভুল পথে আসিনিত? পরক্ষনেই সংশয়ের পাতলা মেঘ কেটে গিয়ে বিশ্বাসের দৃড়তা ঘোষিত হয়- ভুল হতেই পারে না। এটাই সঠিক পথ-একমাত্র পথ। অগ্রসরতাই বিচক্ষনতা

কিন্তু একি! সরলরেখা বরাবর রাস্তা শেষ হতেই যে বাড়িগুলো নজরে পরছে কোনটাই চেনা মনে হচ্ছে না। জীবনে যেন এই প্রথম এরকম অদ্ভুদ আলাদারকম সুন্দর বাড়ি দেখা হল। যে বাড়িগুলো সাধারণতঃ পটে প্রদর্শিত হয়। নগর-বন্দর,কোলাহল,চেনা সমস্ত কিছু থেকে বিচ্ছিন্ন । যেন একগুচ্ছ পরিত্যাক্ত আবাস কিন্তু পরিত্যাক্ত নয়।

কখন যে রিদয়-তন্ত্রিতে ঝংকৃত সুরের মুর্ছনা স্তব্ধ হয়েছিল কেউ বুঝতেও পারিনি। তবে এটা বেশ বুঝতে পারছি- দুজনের-ই বুকের মাঝখান থেকে ভীষন ক্ষীন অনেকটা নৈশব্দের মত ডিপ ডিপ শব্দের ভ্রণ প্রকাশের চেষ্টা করছে। দুজনেই দাঁত-মুখ খিচিয়ে আছি যেন কার বিহবলতা প্রকাশ না পায়। প্রাণপন চেষ্টা করছি- শব্দের ভ্রুণ যুগলকে শীতল করবার জন্য যাতে অনুনাদ সৃষ্টি না হয়।

সকল যুক্তি-বিশ্বাসকে ভেংচি কেটে পথ স্পষ্ট করল যে আমরা পথভ্রস্ট। নাহ! আসলে পথ হারিয়েছি। কিন্তু হারানোর একি ছিরি। সম্পূর্ণ অনভিপ্রেত,অপ্রত্যাশিত এক্তি ভুতুড়ে পথে এসে পরলাম।সম্মুখে ধাবিত হওয়া ছাড়া কোন গতি নাই। পিছনের সকল রাস্তা অবরুদ্ধ। অবরুদ্ধ মানে অবশ্য প্রাচির বেষ্টিত ন্য।আমাদের বাহনের জন্য সম্পূর্ণ অনপযোগী। এও হতে পারে পশ্চাদপদ সম্পর্কিত সকল নথি মস্তিস্ক হারিয়ে ফেলেছে।

আশ্চার্যজনক হলেও সত্যি যে বাধাহীনভাবে এগিয়ে যাচ্ছি। আশ্চার্য হব নাই বা কেন!সদর রাস্তা বলে কন রাস্তা নাই, এজমালি রাস্তা বলে কোন কিছু নাই। যে পথ মাড়িয়ে চলেছি সবটাই কারো না কারো  বহির্বাটি। তবে সবকিছুরই একটা সীমা থাকে। বাধাহীনও বাধাগ্রস্ত হয়। এবং থিক তাই হল। কে বা কাহারা,কি রুপ বা বর্ণ কিছুই বলতে পারবনা। তবে শ্বাসরুদ্ধকর কোন কিছু একটা সম্মুখেই দাড়াল। আত্মারাম খাঁচার মধ্যে স্বস্তি পাচ্ছে না,ছতফট করছে যেন বের হয়ে মুক্ত হবে। অথবা হৃদযন্ত্রটা প্রচন্ড ঘূর্নির মধ্যে পড়ে অসংখ্যবার মোচড় খেয়ে ছিড়ে পড়তে পড়তে পড়লনা। দোলকের মত ঢং ঢং করে দুলতে লাগল।

(  চলবে)

অর্থনীতির পরিভাষা

কারটেলঃ

দুই বা ততধিক প্রতিযোগী কম্পানির একত্রিত হয়ে বাজারের উপর নিয়ন্ত্রন নেয়াকে কারটেল বলে

সাধারনতঃ  একই জাতের পণ্য বা সেবা উতপাদনের ক্ষেত্রে এরকম   হয়।

 

ট্রাস্তঃ

মনপলি বাজারের উদ্দেশে গঠিত সাংগঠনি কাঠামকে ট্রাস্ট বলে

 

খোলা চিঠি দিলাম তোমায় কমরেড কিম

কমরেড কিম জং ইল তোমাকে লাল সালাম।

তোমার মৃত্যু যেমন তোমার দেশের মানুষকে শোকাহত করেছে তেমনি আমাদেরও অনেককে করেছে।তোমার সাম্রাজ্জবাদ-বিরধী অনমনীয়তা আমাদের অনুপ্রেরনা। তাই আমাদের শ্রদ্ধাঞ্জলি।যদিও তোমার মৃত্যুতে বিশ্বের অনেক দেশের মত আমাদের ছোট্র বাংলাদেশেও তোমার অনেক রহস্যের ফিরিস্তি তুলে ধরা হয়েছে । তোমার জন্ম-রহস্য থেকে শুরু করে তোমার সম্পদ অর্জন মানে আত্মসাতের রহস্য।জানি তুমি কিছু মনে করনি। তোমার জীবদ্দশায় নিজ দেশে প্রিয় আখ্যায়িত হলেও বহির্বিশ্বে তুমি বদ্মেজাজি-খামখেয়ালি বলে ঘৃণিত। স্তালিন যেমন পুজিপতিদের প্রশংসা ভয় পেতেন আমার বিশ্বাস করতে ভাল লাগে যে তুমিও তাই পাও।

তাই বলে, তোমার সমস্ত কর্মকাণ্ডকে বিনা বাক্যে আমরা মেনে নিই তা ভাবলে ভুল করবে।যারা আন্তরজাতিকতাবাদে বিশ্বাস করে তারা তোমাদের অর্জিত অভিজ্ঞতার ভাগীদার হতে চায়। কিন্তু বঞ্চিত হয়। তোমাদের বিচ্ছিন্নতায় তারা উতকণ্ঠিত । একটি বিশেষ শাষণ কাঠামোর সাথে যুক্ত থাকার কারনে তার অন্তর্নিহিত জ্যান্ত সমস্যা বা সম্ভবনা সম্পরকে হয়ত তোমরাই ভাল বুঝতে পারবে। কিন্তু প্রায়োগিগ দিকের বাইরে তাত্তিক একটি দিকও আছে। এবং সেটাই মূল। সেখানে তোমরা ভুলও করতে পার। যারা সমাজতান্ত্রিক আদর্শ লালন করে গোটা বিশ্বের মেহনতি মানুষকে সকল প্রকার শোষণ-নিপিড়ণ থেকে মুক্ত করার স্বপ্ন নিয়ে আপষহীন লড়াইয়ে অবতীর্ণ ,তারা আন্তরিকভাবে তোমাদের সহযোগী হতে পারে। শুধু চাই প্রবেশাধীকার। তোমরা সেখানে ব্যর্থ হয়েছ। বঞ্চিত হয়েছ। বঞ্চিত করেছ।

তোমাকে একটা উদাহরণ দিই, কমরেড। সমাজতান্ত্রিক রাশিয়া যখন সাম্যবাদে পৌছার কাছাকাছি বলে তৃপ্ত বোধ করত ঠিক সে সময় তারা ব্যক্তিবাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নামে স্তালিনকে গুরুবাদী প্রবণতার দোষে দুষ্ট করে প্রকারন্তরে তার সকল অর্জনকেই মুছে ফেলা শুরু করলো। আম্লাতন্ত্রের সাথেই স্তালিন উচ্চারিত হল। মারক্সবাদে যে অথরিটির ধারনা সেটাকে লঙ্ঘন করা শুরু হল।

তৎকালীন রাশিয়ার নেতৃবর্গ উপর্যুক্ত সমস্যা সমাধাঙ্কল্পে যে বিপদজনক সমাধানের পথে গেল সেটাকে ঠিক মনে করেননি ভারতের এস ইউ সি আই পার্টির সাধারণ সম্পাদক শিবদাস ঘোষ। তিনি একটি খোলা চিঠি লেখেন। স্তালিনবিরোধি পদক্ষেপ প্রসঙ্গে শিরনাম-যুক্ত খোলা চিঠিতে উক্ত সমস্যাসমূহের কারণ ও সমাধান তুলে ধরেণ। যা আজকে অনেকের কাছে গৃহীত। কিন্তু সেদিন তারা একটি অখ্যাত পার্টির অখ্যাত ব্যাক্তির মতামত মনে করে মূল্য দিতে পারেনি। চরম মূল্য দিতে হয়েছে গোটা সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে।

বিশ্বের মানচিত্রে কোরিয়া ভাস্বর হয়ে থাক। এমনটা যারা চায়-আপনাদের নেতা নির্বাচন পদ্ধতি তাদেরকে অস্বস্তিতে ফেলে। আপনার বাবার পরে আপনি সে দেশের নেতা হয়েছেন। হতেই পারেন।আপনার বাবার মৃত্যুর অনেক আগে থেকেই পার্টির সাথে যুক্ত থেকে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখছিলেন। তার- ই ধারাবাহিকতায় হয়ত যোগ্যতার মাপকাঠিতেই সেখানে এসেছেন। কিন্তু আপনার মৃত্যুর পর যখন আপনার ছেলে সে জায়গায় আসীন হলেন তখন আমাদের চিন্তার কোন কানাগলি দিয়ে সন্দেহের একটা বাতাস বয়ে গেল। তবে, আপনারা কি গনতান্ত্রিক-কেন্দ্রিকতা থেকে সরে গিয়ে কেন্দ্রিকতা দ্বারা পরিচালিত হচ্ছেন? আপনারা জানেন, বিংশ শতাব্দির শুরুতে লেনিন,রোজা লুক্সেম্বার্গ ,গ্রামসি প্রমুখ একমত হয়েছিলেন যে সমাজতান্ত্রিক গনতন্ত্র বুর্জোয়া গনতন্ত্রের চেয়েও উন্নত হবে। মাক্সবাদি-লেনিনবাদিরা এগুলো অস্বীকার করতে পারে না।

কি অদ্ভুত! তুমি থেকে কখন আপনি হয়ে গেলেন।মনে কিছু করবেন না। দূরত্ব যখন তৈরি হয়েই গেল, আলোচনাটা সেভাবেই এগিয়ে নেয়া যাক।

গনতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাহীন ধরে নিয়ে মাঝে মাঝে ভাবি আপনার দেশের মানুষগুলি বোধহয় গুমোট,হাসে না ,কাঁদে না।নাহ্ !তারা আমাদের কল্পনাকে হার মানায়।আশ্বস্ত হই। অবশ্য সেটা বুঝতে হয় আপনাদেরই শুভাকাঙ্খি কোন চিত্র পরিচালকের সিনেমা দেখে।সিনেমার নাম DPRK:A DAY IN THE LIFE(2006)।

মারক্সবাদি মাত্রই বুঝা উচিত হুবহু নকল করে বিপ্লব কিংবা বিনির্মাণ কোনটাই সম্ভব না। তাই আপনার বাবা জুসে(juche) নামক একটি ধারনার জন্ম দিতে পেরেছেন। যার অর্থ আত্ম নিরভরশীলতা। এটি ৩ টি মৌলিক নীতির উপর প্রতিস্থিত-

১. রাজনৈতিক স্বাধীনতা (Chaju)

2.অর্থনৈতিক আত্ম নিয়ন্ত্রন(Charip)

3. সামাজিক আত্ম নিরভরশীলতা(Chaw)

আপনি নিজে ১৯৯৬ সালে সনগুন(Songun) মানে সামরিক অগ্রাধিকার নীতি সংযোজন করেন।

কিন্তু বিপাকে পরে যাই,ভীত হই যখন শুনি(নিজে দেখিনি) মারক্সবাদ-লেনিনবাদ শব্দের পরিবর্তে জুসে শব্দটাই ব্যবহার করতেই স্বাচ্ছন্দ বোধ করেন। শব্দ ব্যবহারে আমাদের খুব একটা মাথা ব্যথা না থাকলেও মাঝে মাঝে এর পরিনাম নিয়ে ভাবতে গেলে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে। ভাবি-আপনাদের অজান্তেই কি মানব সভ্যতার মুক্তির দিশারি মতবাদ ,মারক্সবাদ-লেনিনবাদকে অস্বিকার করে বসবেন?

আমাদের আশংকার ডালপালা গজাতে থাকে। যখন দেখি-

১.২০০২ সালে সেপ্টেম্বরে আপনারা সিনুইজুতে international financial zone  গঠন করেছিলেন। মনে আছে? এই মুক্ত বাজারকে কোরিয়ার হংকং বলা হত।

২.একই বছরের জুলাই মাসে বিদ্যুৎ এবং খাদ্যে রেশনিং তুলে দেয়া হয় এবং শ্রমিকদের কাজে উতসাহিত করার জন্য রাস্ত্র-নিয়ন্ত্রিত মূল্যকে বাজারের কাছে ছেরে দেয়া হয়। ব্যক্তি উদ্যোগকে আরো ছার দেয়া হয় এবং কৃষকদের মুনাফায় উৎসাহিত করা হয়।

৩.২০০২ সালের শেষের দিকে বাজারকে উন্মুক্ত করা হয়। তথ্যসূত্রঃhttp://www.marxist.com/where-is-north-korea-going101006.htm

ফলাফল, আপনার দেশের মানুষ দীর্ঘকাল পরে দর কষাকষির আনন্দ পাচ্ছেন। চৈনিক বনিকেরা পিলপিল করে আপনাদের বাজারে ধুকছে। উপজাত হিসাবে আরেকটা সম্ভবনাকে উড়িয়ে দেয়া যায় না।একটি প্রতিবেদনের দিকে চোখ রাখা যাক-

China’s non-financial direct investment in North Korea was about US$14.9 million in 2005 and $14.1 million in 2004, jumping from $ 1.1 million in 2003, according to statistics from the Chinese Commerce Ministry. Bilateral trade reached almost $1.4 billion in 2004, and further jumped to about $1.6 billion in 2005, while the first five months of 2006 hit $61 million.”Asia Times,August 8,2006

কমরেড কিম,আস। আমরা একটু দূরত্ব কমিয়ে আনি। খোলামেলা আলোচনা করি। আমরা বিশ্বাস করি তোমরা আদর্শ থেকে এখনও বিচ্যুত হওনি। তবে ,কিছু মৌলিক ঘাটতি তৈরি হয়ে গেছে। তৈরি হও । শুদ্ধ করে নাও। পুজিবাদ-সাম্রাজ্যবাদের ভিত নড়ে গেছে। আগামিদিনের ভবিষ্যত-সমাজতান্ত্রিক ভবিষ্যত।